অস্বস্তিকর সময়ে বাড়বে ব্যবসার খরচ
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে ডিজেলনির্ভর অর্থনৈতিক কার্যক্রমে। ডিজেল সরাসরি সাধারণ মানুষের সঙ্গে জড়িত। এটাকে গরিবের জ্বালানি বলা হয়। কৃষি, গণপরিবহন, পণ্য পরিবহনসহ অর্থনীতির প্রায় সব খাতের সঙ্গে এর ব্যবহার জড়িত। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে উৎপাদন খরচ—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়বে।
দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ এখনো পুরোপুরি নিরবচ্ছিন্ন না হওয়ায় শিল্পকারখানার একটি অংশকে বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হয়। তাতে বিদ্যুতের চেয়ে তিন গুণ বেশি খরচ হয়। ফলে ডিজেলের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়বে স্থানীয় ও রপ্তানিমুখী উভয় ধরনের পণ্য উৎপাদনে। এতে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় আরও বাড়বে।
এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে পড়তে পারে। এমনিতেই বিক্রি কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে ব্যবসার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। আর পণ্যের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপরও নতুন চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
সরকারের দিক থেকে জ্বালানিতে ভর্তুকির চাপের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানির দাম বাড়লেও সরকার সে অনুযায়ী নিয়মিত সমন্বয় করেনি—এমন যুক্তি দেওয়া হয়েছে। তাই দাম সমন্বয়ের প্রয়োজন থাকলেও একবারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি ব্যবসা ও সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কমার প্রবণতা বজায় থাকলে দেশেও দ্রুত সমন্বয় করা প্রয়োজন। সরকার নিয়মিত মূল্য সমন্বয়ের যে ব্যবস্থা চালু রেখেছিল, সেই ব্যবস্থায় ফিরে গিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের নিম্নমুখী দামের সুবিধা ভোক্তাদের দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
জ্বালানির দাম বাড়ানোই সমস্যার একমাত্র সমাধান কি না, সেটিও বিবেচনার বিষয়। জ্বালানি সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থার অপচয় এবং সিস্টেম লস কমানো গেলে ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। দক্ষতা বাড়ানোর পরিবর্তে মূল্য বাড়ানো তুলনামূলক সহজ পথ হলেও এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বেশি হতে পারে।
একদিকে সরকার ব্যবসা সহজ করার কথা বলছে, অন্যদিকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি ব্যবসার ব্যয় বাড়াচ্ছে। ফলে বর্তমান সময়ে এই দুই উদ্যোগের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি, কম বিক্রি ও বাড়তি পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে থাকা ব্যবসার জন্য জ্বালানির দাম বাড়ানো নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। সব মিলিয়ে অস্বস্তিকর একটি সময়ে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে।
তাই জ্বালানির দাম নির্ধারণে সরকারের রাজস্ব ও ভর্তুকির হিসাবের পাশাপাশি কৃষি, পরিবহন, শিল্প উৎপাদন ও সাধারণ ভোক্তার ওপর এর সামগ্রিক প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দ্রুত সমন্বয় করা দাবি জানিয়ে রাখছি।
একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যবস্থাপনার অপচয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে মূল্যবৃদ্ধির চাপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সরকারের রাজস্ব বাড়ছে না কিন্তু সামনের মাস থেকে বেতন বৃদ্ধির কারণে খরচ বাড়ছে। তাই সরকারের ওপরও ব্যয়ের চাপ বাড়ছে।
মো. ফজলুল হক, প্রশাসক, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)।