সার ও চা-শিল্প ছাড়া অন্য সব শিল্পের জন্য প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম ৩০ টাকা করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। তাতে গ্যাসচালিত ক্যাপটিভ জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় শিল্পের গ্যাসের দাম ইউনিট প্রতি বাড়ছে সাড়ে ৮৭ শতাংশ। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের গ্যাসের দাম বাড়ছে একলাফে ১৭৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। এভাবেই বড় ব্যবসায়ীরা ছোট-মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ডেকে আনল মহাবিপদ। অথচ ১৪ বছরে ছয় দফায় গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। প্রত্যেকবারই ছোট, মাঝারি ও বড় শিল্পের জন্য আলাদা দাম নির্ধারণ করেছে সরকার। এবার সেটি অনুসরণ করা হয়নি। 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা কি বুঝেশুনেই কাজটি করেছেন? উত্তরটা জানতে হলে দেখতে হবে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইসহ অন্যান্য পণ্যভিত্তিক বাণিজ্য সংগঠনের নেতৃত্বে কারা। সবগুলো প্রভাবশালী সংগঠনের শীর্ষ পদে বসে আছেন বড় ব্যবসায়ীরা। আগে একসময় সাধারণ সদস্যদের ভোটে এফবিসিসিআইসহ অধিকাংশ বাণিজ্য সংগঠনে নেতা নির্বাচিত হতো। নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের সেই ব্যবস্থা এখন প্রায় জাদুঘরে যেতে বসেছে। এফবিসিসিআইয়ে সর্বশেষ ভোট হয়েছিল ২০১৭ সালে, তা–ও আংশিক। মূলত সমঝোতার মাধ্যমেই অধিকাংশ বাণিজ্য সংগঠনের নেতা নির্বাচিত হচ্ছেন। এফবিসিসিআইসহ কয়েকটি সংগঠনের শীর্ষ নেতা কে হবেন, তা আবার সরকারের উচ্চপর্যায়ের সবুজসংকেতে হয়। তাতে বড় সংগঠনে ছোটদের (ছোট-মাঝারি ব্যবসায়ী) সংখ্যা শূন্যের কোঠায়। 

গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও ভর্তুকি কমাতে গত বছরের শেষ দিকে জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়। তখন প্রভাবশালী বাণিজ্য সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন সরকারের মন্ত্রী-সচিবেরা। সর্বশেষ গত মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ গ্যাসের চাহিদা, সরবরাহ ও দাম নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সভা করেন। সরকারের পক্ষ থেকে সেই সভায় গ্যাসের প্রতি ইউনিটের দাম ৪০ টাকা প্রস্তাব করা হলে ব্যবসায়ীরা নেতারা তাতে আপত্তি জানান।

পরে বস্ত্রকলমালিকদের সংগঠন বিটিএমএ, পোশাকশিল্পের মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএসহ কয়েকটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এফবিসিসিআইয়ের নেতারা। ওই সভা শেষে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাওয়ার শর্তে ক্যাপটিভের জন্য প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম ২৫ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করেন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন। সেই চিঠিতে অন্য শিল্পের গ্যাসের দাম কী হবে, তা নিয়ে কোনো কথা ছিল না। 

১৮ জানুয়ারি গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়। ওই দিনই জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে বলেন, ‘...তারা (ব্যবসায়ীরা) যদি নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ চায়, তাহলে যে মূল্যে কিনে আনব, সেই মূল্যই তাদের দিতে হবে। এখানে ভর্তুকি দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।’ 

প্রধানমন্ত্রীর এ মনোভাবের পর বড় ব্যবসায়ী নেতারা দমে যান। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণার পরদিন এফবিসিসিআইয়ের এক অনুষ্ঠানে প্রভাবশালী একটি বাণিজ্য সংগঠনের একজন নেতার সঙ্গে কথা হয়। আলাপচারিতায় তিনি জানালেন, সংসদে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন তাঁরা। ওই দিনই আরও তিন-চারটি বাণিজ্য সংগঠনের নেতারাও একই কথা জানান।

প্রভাবশালী বাণিজ্য সংগঠনগুলো নীরবতা পালন করলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডলার–সংকট এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে এমনিতেই ব্যবসা কঠিন হয়ে গেছে। নতুন করে গ্যাসের পেছনে খরচ তিন গুণ বাড়বে। তাতে ব্যবসায় টিকে থাকাটা আরও কঠিন হয়ে যাবে তাদের জন্য।

ঢাকা চেম্বারের সদ্য বিদায়ী সভাপতি রিজওয়ান রাহমান গতকাল এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, সংকটের সময় কেউ কারও দিকে তাকায় না। ছোট-মাঝারি শিল্পের কথা না ভেবে বড় ব্যবসায়ী নেতারা যেভাবে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব করেছেন, সেটি স্বার্থপর আচরণ। তাঁরা তাঁদের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। সরকারও এই বড় সাহেবদের কথা শোনেন। তাই ডানে–বাঁয়ে হিসাব–নিকাশ না করে সব শিল্পের জন্য গ্যাসের একই দাম নির্ধারণ করেছে। বড়দের বাঁচাতে গিয়ে ছোটদেরও একই কাতারে বিবেচনা না করার এ মানসিকতাও অনৈতিক। 

রিজওয়ান রাহমান আরও বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত নানামুখী সমস্যায় আছে। গ্যাসের দাম ১৭৮ শতাংশ বাড়ানোর পর তাদের সমস্যা আরও বাড়বে। অনেকেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না।