চার বছরে যুক্তরাজ্যের জিডিপি ৬% কমবে

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছাড়ার ফলে আগামী চার বছরে যুক্তরাজ্যের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৬ শতাংশ কমে যাবে। অর্থের হিসাবে এই ক্ষতির পরিমাণ ১০ হাজার ৬০০ কোটি পাউন্ড। ইইউর বাইরে থাকা ব্রিটিশ অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন আশঙ্কাই প্রকাশ করছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)।
ইআইইউ বলছে, ব্রেক্সিট বা ইইউ ছাড়ার অর্থনৈতিক ক্ষতি তিন ধাপে ব্রিটেনের অর্থনীতিতে পড়বে। ২০১৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ কারণে দেশটির অর্থনীতি একটি অস্থির সময় পার করবে। এ সময়ে মার্কিন ডলারের বিপরীতে পাউন্ডের বিনিময় হার ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ কমে যাবে, দেখা দেবে মন্দা। এরপর মধ্যবর্তী প্রভাব হিসেবে ২০১৭ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে দর-কষাকষি চলতে থাকবে।
আর ২০১৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পুরো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার প্রভাব টের পাওয়া যাবে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ২০২০ সালে গিয়ে যুক্তরাজ্যের জিডিপির আকার বর্তমান সময়ের চেয়ে ৬ শতাংশ কমে যাবে। আর তাৎক্ষণিকভাবে আগামী এক বছরে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি ১ শতাংশ সংকুচিত হবে। যুক্তরাজ্যের জিডিপির আকার বর্তমানে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি পাউন্ড, যা বর্তমান বিশ্ব জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশ।
২০০৯ সালের অর্থনৈতিক মহামন্দার মতো আরেকটি বাজে সময়ে যুক্তরাজ্য পড়তে যাচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ইইউ ছাড়ার নগদ প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্রিটিশ পাউন্ডের বিনিময়মূল্য ইতিমধ্যে গত ৩১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের সব প্রধান পুঁজিবাজার সূচকে গত এক সপ্তাহে নিম্নগতি লক্ষ করা যাচ্ছে।
ব্রেক্সিটের কারণে বিশ্বের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে লন্ডনের মর্যাদা হারানোর বিষয়টিও উঠে এসেছে। এ বিষয়ে বলা হয়েছে, ইউরোপে ব্যবসা করার জন্য বহুজাতিক বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর লন্ডনে অবস্থিত। ইইউ থেকে আলাদা হওয়ার কারণে এসব কোম্পানি তাদের আঞ্চলিক কার্যালয় লন্ডন থেকে সরিয়ে ইউরোপের অন্য দেশে নিয়ে যাবে। সেই ইঙ্গিত অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই দিতে শুরু করেছে।
ভারতের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী গোদরেজ গ্রুপের চেয়ারম্যান আদি গোদরেজ মনে করেন, যেসব কোম্পানি ইউরোপের বাজারে প্রবেশের জন্য যুক্তরাজ্যকে প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচনা করছিল, তাদের ব্যবসায়িক কৌশলে এখন পরিবর্তন আনতে হবে।
ইইউ ছাড়ার ফলে যুক্তরাজ্যের বেকারত্ব পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাবে বলে ইআইইউর গবেষণায় বলা হয়েছে। ২০১৮ সালের দিকে এ কারণে বেকারত্ব ৬ শতাংশে গিয়ে পৌঁছাবে। দেশটিতে বর্তমানে বেকারত্বের হার ৫ শতাংশ। ইইউ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে নতুন করে ৩ লাখ ৮৯০ হাজার লোক বেকার হয়ে পড়বেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ইআইইউ।
যুক্তরাজ্যের বাজার অর্থনীতিতে ইইউ ছাড়ার নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর ফলে সাধারণ মানুষের খরচ করার প্রবণতা কমে যাবে। অনিশ্চিত পরিবেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নতুন বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত আটকে যাবে। ঋণ নেওয়ার খরচও এর ফলে বাড়বে। সরকারি বন্ডের মুনাফার পরিমাণও কমে আসবে।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি খাতভিত্তিক ক্ষতির একটি বিশ্লেষণও তুলে ধরেছে ইআইইউ। খুচরা ব্যবসার ওপর প্রভাব সম্পর্কে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে এ খাতে বেচাকেনার পরিমাণ ৩ শতাংশ কমে যাবে। ২০২০ সাল পর্যন্ত এমন নেতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত থাকবে। পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে এ খাতের কোম্পানিগুলোকে অনেক ঝামেলা পোহাতে হবে। পাউন্ডের দুর্বল অবস্থানের কারণে শিল্পের কাঁচামাল ও পণ্য আমদানিতে ব্যবসায়ীদের খরচ বাড়বে।
মন্দার ধাক্কায় যুক্তরাজ্যের মোটরগাড়ির বিক্রি আগামী কয়েক বছরে কমে যাবে। ২০১৭ সাল থেকে এ প্রবণতা শুরু হবে। তবে যুক্তরাজ্যের নিজস্ব গাড়িনির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ইইউ ছাড়ার ফলে কিছু বাড়তি সুবিধা পাবে কারণ ভক্সওয়াগন, মার্সিডিজ, বিএমডব্লিউর মতো জার্মান মোটরগাড়ি ব্র্যান্ডগুলোকে যুক্তরাজ্যের বাজারে বাড়তি নিয়ন্ত্রণের মুখে পড়তে হবে। এতে রোলস রয়েস, ল্যান্ড রোভারের মতো যুক্তরাজ্যের ব্র্যান্ডগুলোর ব্যবসা বাড়বে।
যুক্তরাজ্যের ফার্মাসিউটিক্যালস বা ওষুধ রপ্তানি শিল্প ইইউ ছাড়ার ফলে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়বে। ইউরোপের দেশগুলোতে যুক্তরাজ্যের তৈরি ওষুধ প্রবেশে যেমন সমস্যা তৈরি হবে, একইভাবে যুক্তরাজ্যের বাজারেও বিদেশি কোম্পানির ওষুধ বাজারজাতকরণ বাধাগ্রস্ত হবে। মন্দার কারণে স্বাস্থ্য খাতে সরকারের বরাদ্দ কমে যাবে। এতে স্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষতির পরিমাণ বেশি হবে।
ইআইইউর প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের জ্বালানির বাজারেও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। ইইউর জ্বালানি নীতি ও নীতিনির্ধারণী বিষয়ের ওপর যুক্তরাজ্যের প্রভাব কমে আসবে। বিভিন্ন জ্বালানি শক্তির মূল্য নির্ধারণে তাই যুক্তরাজ্যের কোনো ভূমিকা কার্যত থাকবে না। উল্টো জ্বালানির দামের বিষয়ে যুক্তরাজ্যকেই এখন অন্যদের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।
যুক্তরাজ্যের টেলিযোগাযোগ খাতেও ব্রেক্সিট নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এত দিন ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণে দেশটির নাগরিকেরা বিশেষ রোমিং বা মূল্য সুবিধা পেতেন, যেটি ইইউ ছাড়ার পর থাকবে না। আগামী বছর থেকেই যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের ইউরোপের অন্য দেশ থেকে ফোন করতে বাড়তি অর্থ গুনতে হবে। টেলিযোগাযোগ খাতে বিনিয়োগ ব্যয়বহুল হওয়ায় মন্দার কারণে এ খাতের প্রবৃদ্ধি আটকে যেতে পারে।
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের বিশ্লেষক ড্যানিয়েল হ্যারাল্যামবাস এ বিষয়ে বলেন, ইইউ ছাড়ার সিদ্ধান্ত যুক্তরাজ্যের রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপর অবশ্যই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিষয়টি নিয়ে দর-কষাকষি বিনিয়োগকারী ও ভোক্তা সবার জন্য একটি অনিশ্চিত পরিস্থিতি তৈরি করবে। পণ্যসেবার দাম বৃদ্ধি পাবে। সর্বোপরি ইইউভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাজ্যের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্ক জটিল আকার ধারণ করবে।