বাংলাদেশের ৮৭ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারের আয়ের উৎস হলো কৃষি। কৃষি খাতই দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে মূল ভূমিকা পালন করছে।
গতকাল মঙ্গলবার বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রবৃদ্ধি গতিশক্তি-টেকসই দারিদ্র্য বিমোচন’ প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। কৃষি খাতের আয়ের প্রভাব অন্য খাতে কীভাবে পড়ে, সে বিষয়ে বলা হয়েছে, কৃষি খাতে ১০ শতাংশ আয় বাড়লে অকৃষি খাতে আয় বাড়ে ৬ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংক ফলদ, পশুপালন, মৎস্য চাষের মতো উচ্চমূল্যের কৃষি খাতের দিকে মনোযোগী হতে বলেছে। এতে একদিকে কৃষকের আয় বাড়বে, পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে।
প্রতিবেদনটি প্রকাশ উপলক্ষে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আলোচনা সভার আয়োজন করে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেড় দশকের (১৯৯৫-২০১০) হিসাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে কৃষি খাতে মোট উৎপাদিকা শক্তি সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। বাংলাদেশে টোটাল ফ্যাক্টর প্রডাকটিভিটি (টিএফপি) হলো ২ দশমিক ৭ শতাংশ। এই হার চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, ভিয়েতনামের চেয়ে বেশি। জমি, শ্রম, সারসহ কৃষি খাতের উপকরণ ব্যবহার করে যে প্রতিদান বা ফল পাওয়া যায়, সেটাই টিএফপি।
বাংলাদেশে কৃষি খাতের পাশাপাশি অকৃষি খাতেও কর্মসংস্থান বাড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ সালে কৃষি খাতে ১ কোটি ৮৭ লাখ লোক কাজ করতেন। ২০১০ সালে এসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ২৭ লাখ। ১০ বছরের ব্যবধানে এ খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে ২১ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে গ্রামীণ এলাকায় অকৃষি খাতে ১০ বছরে কর্মসংস্থান বেড়েছে ৬৩ শতাংশের বেশি। ২০১০ সালে এ খাতে ১ কোটি ৮৯ লাখ লোক কাজ করতেন। এর ১০ বছর আগে করতেন ১ কোটি ১৬ লাখ লোক।
এক দশকের ব্যবধানে কৃষি খাত থেকে গ্রামীণ পরিবারগুলোর আয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১০ সালে ৯১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা আয় করেছে গ্রামীণ পরিবারগুলো, যা ২০০০ সালে দাঁড়ায় ৬১ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গ্রামাঞ্চলে কর্মসংস্থানে এখনো কৃষিই প্রধান খাত। ২০১৩ সালের হিসাবে, গ্রাম এলাকায় যত কর্মসংস্থান হয়েছে, তাতে ৩৯ দশমিক ৬ শতাংশ কৃষি থেকে, ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ ব্যবসা খাতে হয়েছে। এ ছাড়া উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন সেবায় ১২ শতাংশ, কৃষিশ্রমে ৯ দশমিক ২ শতাংশ, নিম্ন দক্ষতাসম্পন্ন শ্রমে ৮ শতাংশ, পরিবহনে সাড়ে ৬ শতাংশ এবং কৃষি খাতের শ্রমে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ কর্মসংস্থান হয়েছে।
আলোচনা: মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, কৃষিজমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় অকৃষি খাতের দিকে নজর দিতে হবে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য শামসুল আলম বলেন, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি যদি সাড়ে ৩ থেকে ৪ শতাংশে উন্নীত করা যায়, তাহলে অনায়াসেই ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে।
বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর চিমিয়াও ফানের মতে, গ্রাম এলাকায় অকৃষি খাতের বিস্তার হলে উচ্চ মজুরির কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। এ জন্য গবেষণা ও উদ্ভাবনী খাতে বিনিয়োগে বেশি জোর দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের ওপর উপস্থাপনা করেন সংস্থাটির মুখ্য অর্থনীতিবিদ মাধুর গৌতম। আরও বক্তব্য দেন অতিরিক্ত কৃষিসচিব নাজমুল ইসলাম, বিশ্বব্যাংকের অ্যাগ্রিকালচারাল গ্লোবাল প্র্যাকটিসের পরিচালক অ্যাথলার সেনহসার এবং একই বিভাগের ব্যবস্থাপক মার্টিন ভ্যান নিউকপ।