‘পেপপজিটিভ’ বলতে কী ধরনের কার্যক্রম বোঝায়? এই বিষয়ে বাংলাদেশে কি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে?

ইউজেন ইউলেমসেন: পেপপজিটিভ হলো আমাদের একটি কৌশল, যেখানে সমন্বিত রূপান্তরমূলক ও টেকসই উদ্যোগ থাকে। এই পৃথিবী ও মানুষের ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য এমন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়, যার কেন্দ্রে আছে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যবোধ। আমরা বিশ্বাস করি, টেকসই অবস্থার জন্য প্রয়োজন সার্বিক ব্যবসায় কৌশল ও পরিকল্পনা। এক বছর আগে আমরা পেপপজিটিভ চালু করেছি। তিনটি ভিন্ন ভিন্ন স্তম্ভের ওপর পেপপজিটিভ প্রতিষ্ঠিত। এগুলো হলো ‘ইতিবাচক কৃষি’, ‘ইতিবাচক মূল্যপ্রক্রিয়া’ এবং ‘ইতিবাচক পছন্দ’।

পেপসিকো হলো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খাদ্য ও কোমল পানীয় কোম্পানি। আমরা সারা বিশ্বে প্রায় এক লাখ কৃষকের সঙ্গে কাজ করছি। ইতিবাচক কৃষি খাতের স্তম্ভ অনুসারে, আমরা জমিজমাকে শস্য ফলনের জন্য উপযোগী করে ব্যবহার করছি। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রায় আড়াই লাখ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি হচ্ছে।

দ্বিতীয় স্তম্ভ ইতিবাচক মূল্যপ্রক্রিয়ায় কিছু লক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত আছে। যেমন ২০৪০ সালের মধ্যে ‘নেট জিরো’তে পরিণত করা। আমাদের কৃষক, সরবরাহকারী, অংশীদারসহ সব জায়গায় আমরা এই লক্ষ্যে যেতে চাই। ২০৩০ সালের মধ্যে আমার পানির ক্ষেত্রে নেট জিরোতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছি। পানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে নেট ওয়াটার পজিটিভ কোম্পানিতে পরিণত হতে চাই। এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে আমাদের প্রতিটি সেবার বিপরীতে প্লাস্টিকের ব্যবহার অর্ধেক করতে চাই। এ ক্ষেত্রে পুনর্ব্যবহার করার কৌশল প্রতিষ্ঠা করা হবে। তাই পুরো প্যাকেজিং প্রক্রিয়ায় পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থাপনা স্থাপন করা হবে।

তৃতীয় স্তম্ভ, ইতিবাচক পছন্দ অনুসারে ভোক্তাদের জন্য আমাদের পণ্যে হ্রাসকৃত বা চিনিবিহীন, হ্রাসকৃত সোডিয়াম ও চর্বি ইত্যাদি বেছে নেওয়ার সুযোগ অব্যাহত রাখা হবে। কোভিড প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধ রক্ষার প্রচেষ্টা আছে। বেসরকারি সাহায্য সংস্থা ব্র্যাকের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মধ্যে ১৪ লাখ খাবার প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। ব্র্যাকের সহযোগিতায় পেপসিকো ফাউন্ডেশন কোভিডের সুরক্ষা তথ্য প্রচার করেছে। এ ছাড়া ব্র্যাকের সঙ্গে মিলে ‘সবার জন্য নিরাপদ পানি’ কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে দুর্যোগপূর্ণ এলাকা কক্সবাজারের মানুষের জন্য সুলভ মূল্যে পানির চাহিদা মেটাতে পানি শোধনাগার নির্মাণ করা হয়েছে।

পেপসিকোর খাদ্য ও কোমল পানীয়র বিভিন্ন পণ্য আছে। ভোক্তাদের কাছ থেকে এসব পণ্য সম্পর্কে কেমন সাড়া পাচ্ছেন? ভোক্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের কৌশলটা কেমন?

ইউজেন ইউলেমসেন: বাংলাদেশে ব্যবসা নিয়ে আমরা খুবই গর্বিত। পেপসিকো বাংলাদেশের অন্যতম বড় কোমল পানীয় কোম্পানি। এখানে আমাদের ব্যাপক সাফল্য আছে। সেভেন আপ, পেপসি, অ্যাকুয়াফিনার মতো ব্র্যান্ড আছে আমাদের। অন্যদিকে স্ন্যাকসের মধ্যে আছে কুরকুরে, লেইস; এগুলো শিগগিরই এ দেশে উৎপাদন করতে যাচ্ছি। আমাদের পণ্যের ওপর ভোক্তাদের আগ্রহ অনেক বেশি, যা আমাদের গর্বিত করেছে। এর ফলে উচ্চ মানের পণ্য ও ভোক্তাদের চাহিদা পূরণে আমাদের দায়িত্ববোধ বেড়ে গেছে। ট্রান্সকম গ্রুপের সঙ্গে মিলে আমরা স্থানীয়ভাবে স্ন্যাকস ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে যাচ্ছি। আমরা বাংলাদেশেই লেইস পটেটো চিপস উৎপাদন করব। এই চিপস বানানোর জন্য আমরা দুই হাজার স্থানীয় আলুচাষির সঙ্গে কাজ শুরু করেছি। তাঁদের বেশির ভাগই ক্ষুদ্র চাষি। এভাবে পেপসিকো তাঁদের খেতে পৌঁছে গেছে। তাঁদের আয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে। তাঁদের প্রযুক্তিগত জ্ঞানে সমৃদ্ধ করা হচ্ছে।

২০ বছরের বেশি সময় ধরে পেপসিকোর সঙ্গে বাংলাদেশের ট্রান্সকম গ্রুপের অংশীদারত্ব আছে। ট্রান্সকম গ্রুপের সঙ্গে সম্পর্কের মাত্রা কতটা বিকাশমান?

ইউজেন উইলেমসেন: ট্রান্সকম গ্রুপের সঙ্গে আমরা ২০০০ সালের মার্চ মাস থেকে কাজ করছি। ট্রান্সকম হলো সারা বিশ্বের মধ্যে পেপসিকোর অন্যতম অংশীদার। আমরা একসঙ্গে সমৃদ্ধ ব্যবসা করছি। ২০ বছর পরও আমরা বিশ্বাস করি, আমরা এখনো শুরুর পর্যায়ে আছি। কারণ, আমি মনে করি, আমাদের একসঙ্গে কাজ করার আরও সুযোগ আছে। বাংলাদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ অনেক। আমরা কোম্পানির নৈতিকতা ও বিনিয়োগকে মূল্য দিই। আমাদের কোম্পানি এখন মানবসম্পদ উন্নয়ন ও তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ নিয়ে কাজ করছে। একই সঙ্গে টেকসই ব্যবসা নিয়েও কাজ হচ্ছে।

সুস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে ভোক্তাদের চাহিদার পরিবর্তন হচ্ছে। ভারতে বিভিন্ন ব্র্যান্ড এ বিষয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় পরিবর্তন আনছে। বাংলাদেশে পেপসিকো কী ধরনের বৈচিত্র্য আনছে?

ইউজেন উইলেমসেন: বাংলাদেশে আমাদের কোম্পানি বেশ ভালো অবস্থানে আছে। আমাদের ভালো ব্র্যান্ডের পণ্য আছে, যা ভোক্তারা পছন্দ করেন, আস্থায় রাখেন। আমাদের পণ্যতালিকা ভোক্তাদের পছন্দ অনুসারে বিন্যস্ত করা হয়েছে। যেমন: উদ্‌যাপন ও উৎসবের মুহূর্তের জন্য পেপসি, সেভেন আপ, কুরকুরে আছে। আবার চিনিমুক্ত পণ্যের ভোক্তাদের জন্য সেভেন আপ লাইট, ডায়েট পেপসি আছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আমরা ‘কোয়াকের ওটস’ বানাব। ভোক্তাদের স্বার্থেই এসব পণ্য উৎপাদন করা হয়।

বাংলাদেশ সম্পর্কে আপনি কি আলাদা করে কিছু বলবেন?

ইউজেন ইউলেমসেন: এবারই আমার প্রথম বাংলাদেশ সফর। এই সফর আমার জন্য বেশ শিক্ষণীয়। আমি বাংলাদেশের জনগণ ও ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পেরেছি। আমি বিশ্বাস করি, এ দেশের উন্নতির ব্যাপক সম্ভাবনা আছে। গত ১০ বছরে এ দেশে ধারাবাহিকভাবে ৭ শতাংশের মতো মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের সাফল্যে অনবরত অবদান রেখে চলেছে। আমরা শুধু এ দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগ করতেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নই; বাংলাদেশের সাফল্যের জন্য দক্ষতা স্থানান্তরে কাজ করছি।