বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এর আগে গত বছরের এপ্রিল থেকে ব্যাংকঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশে বেঁধে দেওয়া হয়। তার ধাক্কা এসে লাগে আমানতের সুদহারেও। কমতে কমতে গত জুলাই শেষে ব্যাংক খাতে আমানতের গড় সুদহার নেমে আসে ৪ শতাংশে। এটিও গড় সুদহার। কোনো কোনো ব্যাংকে আমানতের সুদহার ২ শতাংশে নেমে গেছে। অন্যদিকে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৫ শতাংশের কাছাকাছি। মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিলে ব্যাংকে টাকা রেখে সাধারণ মানুষ আসলে কোনো মুনাফা পান না। বরং টাকার মান কমে। এ অবস্থায় গত আগস্টে ব্যাংকের আমানতের সুদহার মূল্যস্ফীতির ওপরে রাখার বাধ্যবাধকতা আরোপ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

মোটাদাগে দেশের মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের বড় অংশই হয় ব্যাংকে, না হয় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ হয়। দেশের সঞ্চয়ী মানুষের একটা বড় অংশই সঞ্চয়পত্রে টাকা রেখে সেই মুনাফার টাকায় জীবনধারণ করেন। বিশেষ করে অবসরে যাওয়া লোকজন।একদিকে বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অন্যদিকে কমছে আয়। করোনা এসে অনেক মানুষকে কর্মহীন করেছে। তাঁদের একটি অংশ সঞ্চয়ের টাকার সুদে টিকিয়ে রেখেছে জীবন।

ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্রের বাইরে সাধারণ মানুষের বিনিয়োগের আরেকটি মাধ্যম শেয়ারবাজার। ব্যাংকে সুদ যখন কমে যায়, সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে যখন কড়াকড়ি আরোপ করা হয়, তখন টাকা যায় শেয়ারবাজারে। নানা পন্থায়। ব্যক্তি থেকে প্রতিষ্ঠান—সবাই টাকার বিপরীতে সর্বোচ্চ মুনাফা পেতে চান। এ জন্যই যেখানে বেশি মুনাফা দেখেন, সেদিকে ছোটেন মানুষ। যেখানে বেশি মুনাফা, সেখানে আইনকানুন, বিধিবিধান না মানার প্রবণতাও বেশি। এ জন্য শেয়ারবাজারে আইন ভেঙে বিনিয়োগ করে ব্যাংক। আবার মানুষকে বেশি মুনাফার লোভ দেখিয়ে গড়ে ওঠে ইউনিপেটু, ডেসটিনি, যুবক থেকে শুরু করে হালের এহসান গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠান; যেখানে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে শেষ পর্যন্ত সর্বস্বান্ত হন সাধারণ মানুষ। এর জন্য সরকারের নীতি সিদ্ধান্ত যেমন দায়ী, তেমনি ব্যবস্থাপনার অদক্ষতাও দায়ী।

ধরা যাক, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানোর সিদ্ধান্তের বিষয়টি। সঞ্চয়পত্র সরকারের দায়। তাই দায় কমাতে নানা নীতি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মানুষকে সঞ্চয়পত্র কেনায় নিরুৎসাহিত করছে সরকার। প্রতিবছর বাজেটে সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে যে পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে, বছর শেষে তার চেয়ে অনেক বেশি সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়। তাতে সুদ পরিশোধ বাবদ সরকারের খরচ অনেক বেড়ে যায়। আবার সঞ্চয়পত্রের সুদ বেশি হওয়ায় ধনীদের একটি বড় অংশ নামে–বেনামে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে রেখেছেন। ফলে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে সরকারের দেওয়া উচ্চ মুনাফার সুবিধা প্রকৃত অর্থে যাঁদের কাছে যাওয়া উচিত, তার বদলে ধনীদের পকেটে চলে যাচ্ছে। সে জন্য আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষায় অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমানোর পক্ষে সরব। সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমানোর সরকারের এ সিদ্ধান্তকে সব শ্রেণির মানুষই হয়তো সমর্থন দিত, যদি দেশে সঞ্চয় বা বিনিয়োগের আরও বেশি সুযোগ থাকত কিংবা বিকল্প বিনিয়োগের যেসব সুবিধা বিদ্যমান রয়েছে, সেখানে অর্থের নিরাপত্তা ও সুশাসনের বিষয়টি নিশ্চিত থাকত। কিন্তু কোনোটাই নেই। তাই অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকার সবদিক যথাযথভাবে পর্যালোচনা করেছে কি? এক বছর ধরে শেয়ারবাজার বেশ চাঙা। এ চাঙাভাবের পেছনে বড় কারণ ছিল ব্যাংকে আমানতের সুদহার কমে যাওয়া, করোনার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থবিরতা, ব্যাংক খাতে অলস টাকা জমে যাওয়া ইত্যাদি। তাই ব্যাংকের বদলে অনেকে শেয়ারবাজারকে বেছে নেন।

এখন সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমে যাওয়ায় নতুন করে আরও কিছু টাকা শেয়ারবাজারে ঢুকবে, এ কথা বলাই যায়। তাতে শেয়ারবাজার কোন উচ্চতায় যাবে, সেটি ভাবলে দুশ্চিন্তা জাগে মনে। বেশি লাভের আশায় ছুটে আসা মানুষগুলো শেষ পর্যন্ত আসল নিয়ে ফিরতে পারবেন তো?

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই মাস শেষে ব্যাংক খাতের বাইরে তথা মানুষের হাতে থাকা টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ২৭ হাজার ৪২ কোটি। জুন মাসেও মানুষের হাতে থাকা টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯ হাজার ৫১৭ কোটি। এক মাসের ব্যবধানে মানুষের হাতে থাকা টাকার পরিমাণ বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার কোটি। এ টাকার একটি অংশই ঘুরেফিরে সঞ্চয় হিসেবে আবারও ব্যাংকে ফেরার কথা। কিন্তু সুদের হার কমিয়ে ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্রে টাকা রাখতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। তাহলে সাধারণ মানুষ টাকা রাখবে কোথায়?

ব্যাংক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন