default-image

কোনো ব্যাংকে নতুন হিসাব খুলতে গেলে সেই ব্যাংকের কাছে আপনি অচেনা। তাই কোনো ব্যাংকে হিসাব খুলতে গেলে ওই ব্যাংকেরই কোনো গ্রাহককে আপনার পরিচয়দানকারী বা ইন্ট্রোডিউসার হতে হয়। ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে এ বিধান চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। এ শর্তের কারণে অনেক মানুষের ব্যাংক হিসাব খুলতে না পেরে ব্যাংক থেকে ফিরে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

সরকারি চাকরির সুবাদে সরকারি ব্যাংকে হিসাব ছিল। একটু উন্নত সেবার জন্য ২০১৫ সালে একটি বেসরকারি ব্যাংকে যাই।
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ফরিদুল আলম

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের মধ্যে নতুন গ্রাহককে পরিচয় করে দেওয়ার এই নীতি থেকে সরে এসেছে ব্যাংকগুলো। এ কারণে পরিচয়দানকারী ছাড়াই ঘরে বসে নতুন হিসাব খোলা যাচ্ছে। ফলে নতুন ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের যে ভোগান্তিতে পড়তে হতো, তা কেটে গেছে। ফলে ব্যাংক হিসাব খোলা অনেক বেড়ে গেছে।

জানতে চাইলে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ফরিদুল আলম তাঁর নিজের ব্যাংক হিসাব খোলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকারি চাকরির সুবাদে সরকারি ব্যাংকে হিসাব ছিল। একটু উন্নত সেবার জন্য ২০১৫ সালে একটি বেসরকারি ব্যাংকে যাই। কিন্তু ওই ব্যাংকে আমার পরিচিত কোনো গ্রাহক ছিল না। ফলে হিসাব খুলতে না পেরে বাধ্য হয়ে যেখানে আমার পরিচিত গ্রাহক ছিল, সেই ব্যাংকে যেতে হয়।’

ফরিদুল আলম ভাগ্যবান, অন্য ব্যাংকে তাঁর পরিচিত গ্রাহক ছিলেন। কিন্তু গ্রাহকদের পছন্দের ব্যাংকে সব সময় পরিচিত গ্রাহক মিলবে, এমনটা না-ও হতে পারে। তাই এই ভোগান্তি দূর করতে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট চলতি বছরের জানুয়ারিতে গ্রাহক পরিচিতি-সম্পর্কিত (কেওয়াইসি) নতুন নীতিমালা জারি করে। তাতে সহজেই হিসাব খোলার পথ খুলে যায় ও হিসাব থেকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন
আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে ব্যাংকের গ্রাহককে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার বাধ্যবাধকতাটি তুলে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান

এখন জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলেই সহজেই ব্যাংক হিসাব খোলা যাচ্ছে। এই পরিচয়পত্রের মাধ্যমেই গ্রাহক সম্পর্কে জানতে পারছে ব্যাংক। এ জন্য ব্যাংকগুলো অনলাইনের মাধ্যমে সহজেই হিসাব খুলতে পারছে। আর মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানগুলোও অনলাইনে হিসাব খোলার সুযোগ দিচ্ছে গ্রাহকদের। সবই হয়েছে দেশে করোনার কারণে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর।

রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী ব্যাংক গত জুলাইয়ে ‘সোনালী ই-সেবা’ নামের নতুন অ্যাপস চালু করেছে। এর ফলে এ অ্যাপের মাধ্যমে মুঠোফোনে ঘরে বসেই খোলা যাচ্ছে নতুন হিসাব।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান প্রথম আলোকে বলেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে ব্যাংকের গ্রাহককে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার বাধ্যবাধকতাটি তুলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে হিসাব খোলার ভোগান্তি কমে গেছে। এখন অনলাইনেই হিসাব খোলা যাচ্ছে।

জানা যায়, গত জুনে ঢাকা ব্যাংক ঘরে বসে অনলাইনে হিসাব খোলার সুবিধা চালু করে। অনলাইনে হিসাব খুললে ব্যাংকটি বাসায় পৌঁছে দিচ্ছে বিনা মূল্যে এটিএম কার্ড ও চেক বই। ব্যাংকটির প্রতিনিধি নতুন গ্রাহকদের বাসায় গিয়ে হিসাব খোলার ফরমে স্বাক্ষর সংগ্রহ করে আনছে। এই হিসাব খুলতে কোনো গ্রাহককে অন্য গ্রাহকের পরিচয় করিয়ে দিতে হচ্ছে না। পরিচয়পত্র, ছবি ও নমিনি থাকলেই চলছে।

ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমরানুল হক বলেন, ‘আমরা গ্রাহক বাড়াতে কাজ করছি। এ জন্য সহজে হিসাব খোলার উদ্যোগ নিয়েছি। এতে অল্প সময়ে ভালো গ্রাহক মিলছে।’

রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী ব্যাংক গত জুলাইয়ে ‘সোনালী ই-সেবা’ নামের নতুন অ্যাপস চালু করেছে। এর ফলে এ অ্যাপের মাধ্যমে মুঠোফোনে ঘরে বসেই খোলা যাচ্ছে নতুন হিসাব। আর এই অ্যাপ থেকে টাকা স্থানান্তর, বিল পরিশোধ, সরকারি ভাতা, ভর্তুকি গ্রহণসহ ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের সব সুবিধাও মিলছে।

বেসরকারি খাতে দেশীয় দি সিটি ব্যাংকও ঘরে বসে নিজের হিসাব নিজে খোলার জন্য ‘সিটি এখনই অ্যাকাউন্ট’ চালু করেছে। যেসব গ্রাহকের নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র আছে, তাঁরা এই অ্যাপ ব্যবহার করে তাৎক্ষণিকভাবে হিসাব খুলতে পারছেন।
জানতে চাইলে দি সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন প্রথম আলোকে বলেন, যত সহজে ব্যাংক হিসাব খোলা যাবে, গ্রাহক তত বাড়বে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মনীতি মেনেই সহজে ব্যাংক হিসাব খোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে নতুন গ্রাহকদেরও বেশ সাড়া মিলছে।

ব্যাংকের শাখায় না গিয়ে গ্রাহক সেবা দিতে ইসলামী ব্যাংক চালু করেছে 'সেলফিন' নামে ডিজিটাল হিসাব খোলার সুবিধা। এর মাধ্যমে ঘরে বসে জাতীয় পরিচয় পত্র দিয়েই এ হিসাব খোলা যাচ্ছে।

বেসরকারি খাতের মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ঘরে বসে হিসাব খোলার সুযোগ দিতে ‘এমইজি’ নামের নতুন সেবা চালু করেছে। এর মাধ্যমে ঘরে বসেই ব্যাংকটিতে হিসাব খোলা যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, আগে গ্রাহককে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার বাধ্যবাধকতার কারণে অনেক ভালো গ্রাহক ব্যাংক থেকে চলে গেছেন। এখন পরিচয় করিয়ে দেওয়ার বিধানটি তুলে দেওয়ার পরও জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়েই গ্রাহকের পরিচয় মিলছে। এর ফলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে বড় ধরনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

ব্যাংকের শাখায় না গিয়ে গ্রাহক সেবা দিতে ইসলামী ব্যাংক চালু করেছে 'সেলফিন' নামে ডিজিটাল হিসাব খোলার সুবিধা। এর মাধ্যমে ঘরে বসে জাতীয় পরিচয় পত্র দিয়েই এ হিসাব খোলা যাচ্ছে।

একইভাবে ব্যাংকের শাখায় না গিয়ে গ্রাহকেরা খুব সহজে যেকোনো জায়গা থেকে অনলাইনে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের হিসাব খুলতে পারবেন। এজন্য ব্যাংকটি চালু করেছে ই-অ্যাকাউন্ট সেবা।

একইভাবে বেসরকারি খাতের আরও কয়েকটি ব্যাংক হিসাব খুলতে নতুন নতুন সেবা চালু করেছে। এর বেশির ভাগই এসেছে করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর। এতে সহজেই গ্রাহক পাচ্ছে ব্যাংক।

মন্তব্য পড়ুন 0