আবাসন ঋণের সীমা বেড়ে ৪ কোটি টাকা

বাংলাদেশ ব্যাংকছবি: বাংলাদেশ ব্যাংকের ফেসবুক থেকে

রাজধানীর ফ্ল্যাটের দাম ও নির্মাণ খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আবাসন ঋণের সীমা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন ফ্ল্যাট কিনতে বা বাড়ি তৈরি করতে চার কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে ব্যাংকগুলো। আগে সর্বোচ্চ দুই কোটি টাকা ঋণ দিতে পারত। ফলে আবাসন খাতে ঋণের পরিমাণ বাড়বে। গত মঙ্গলবার রাতে এক প্রজ্ঞাপনে আবাসন ঋণের এই সীমা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের কম, শুধু তাদের ক্ষেত্রে ঋণের এই সীমা বাড়বে। যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের নিচে, তারা সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত আবাসন ঋণ দিতে পারবে। আর যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে, তারা দিতে পারবে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত আবাসন ঋণ। ব্যাংক খাতে বর্তমানে ৬টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের নিচে। ফলে এই খাতে চার কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে এই ছয় ব্যাংক।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, একক গ্রাহককে ব্যাংক সর্বোচ্চ কত পরিমাণ আবাসন ঋণ দিতে পারবে, তা নির্ভর করবে সেই ব্যাংকের খেলাপি ঋণের ওপর। এর মাধ্যমে মূলত ব্যাংকের খেলাপি ঋণের ভিত্তিতে আবাসন খাতে ঋণের সর্বোচ্চ সীমা ঠিক করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এত দিন সব ব্যাংকের জন্য অভিন্ন ঋণসীমা ছিল। এখন থেকে যে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ যত কম, সেই ব্যাংক তত বেশি আবাসন ঋণ দিতে পারবে।

আবাসন খাতের ঋণ দেওয়া শীর্ষ ব্যাংকগুলোর একটি সিটি ব্যাংক। ব্যাংকটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক অরূপ হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তটি আবাসন খাতের জন্য ভালো হয়েছে। এতে আবাসন খাত চাঙা হবে। অভিজাত এলাকার প্রকল্পগুলোর বিক্রি বাড়বে। এ ছাড়া গ্রাহকেরা আগের চেয়ে তুলনামূলক কম সুদে ঋণ নিতে পারবে। কারণ, আগে শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চাহিদামতো আবাসন ঋণ দিতে পারত।

কোন ব্যাংক কত ঋণ দিতে পারবে

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের নিচে থাকলে ওই ব্যাংক আবাসন খাতে চার কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে। খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের বেশি, কিন্তু ১০ শতাংশের নিচে থাকলে ৩ কোটি এবং ১০ শতাংশের বেশি খেলাপি থাকা ব্যাংক আগের মতোই সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা পর্যন্ত আবাসন ঋণ দিতে পারবে।

যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কম, তাদের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা বাড়ানো হলেও ঋণ ও নিজস্ব পুঁজির অনুপাত আগের মতোই ৭০: ৩০ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ ফ্ল্যাটের দাম ১০০ টাকা হলে সর্বোচ্চ ৭০ টাকা ব্যাংক অর্থায়ন করবে। বাকি ৩০ টাকা ক্রেতার নিজের থাকতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গত বছরের সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, ১৭টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে রয়েছে। এর মধ্যে ৫ শতাংশের নিচে খেলাপি ঋণ রয়েছে ৬টি ব্যাংকের। ব্যাংকগুলো হলো সিটিজেন্স ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, বেঙ্গল কমার্শিয়াল, ব্র্যাক ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক। ফলে নতুন সিদ্ধান্তে এই ব্যাংকগুলো ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে।

এ ছাড়া ৫ থেকে ১০ শতাংশ খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন ব্যাংক রয়েছে ১১টি। ব্যাংকগুলো হলো মিডল্যান্ড ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, কমিউনিটি ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী, এনসিসি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক ও যমুনা ব্যাংক। এই ব্যাংকগুলো আবাসন খাতে সর্বোচ্চ ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে। অন্য সব ব্যাংক আগের মতো ২ কোটি টাকা ঋণ দিতে পারবে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কোনো ফ্ল্যাটের দাম যদি হয় ৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা, তখন ৫ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ আছে এমন ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকার ঋণ নিতে পারবেন ভোক্তারা।

কারা কত ঋণ দিতে পারবে

  • যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫%–এর নিচে, তারা সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকা

  • যেসব ব্যাংকের খেলাপি ৫ থেকে ১০ শতাংশ, তারা দিতে পারবে সর্বোচ্চ ৩ কোটি টাকা

স্বাগত জানালেন আবাসন ব্যবসায়ীরা

এদিকে আবাসন ঋণের সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা। এক বিজ্ঞপ্তিতে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) জানিয়েছে, তাদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে রিহ্যাবের সভাপতি মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের বর্তমান কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর স্থবির আবাসন খাতকে গতিশীল করতে নানা চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। রাজধানীর বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপের ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালার সংশোধিত প্রজ্ঞাপন এরই মধ্যে জারি করা হয়েছে। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক আবাসন খাতের ঋণের সীমা ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে। তাই আমরা এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত নীতিনির্ধারকদের ধন্যবাদ জানাই।’

আবাসন উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বোচ্চ ঋণসীমা বাড়ানোর ফলে ব্যক্তি অথবা পরিবার যাঁরা নতুন বাড়ি, ফ্ল্যাট বা আবাসন প্রকল্প কিনতে চান, তাঁরা বেশি ঋণ পাবেন। তাতে আবাসন খাতের চাহিদা বাড়বে।