জীবন বিমা খাতে আয় ও সম্পদ বাড়লেও গ্রাহকের দাবি শোধ কমেছে
দেশে জীবনবিমা কোম্পানিগুলোর মোট প্রিমিয়াম আয় কমেছে। কমেছে বিমা দাবি পরিশোধের পরিমাণও। অথচ আগের বছরের তুলনায় ২০২৪ সালে জীবনবিমা খাতের বিনিয়োগ বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে জীবন তহবিলের পরিমাণ ও মোট সম্পদ।
রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি ও বিদেশি মিলিয়ে দেশে বর্তমানে ৩৬টি জীবনবিমা কোম্পানি রয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এসব প্রতিষ্ঠান মোট প্রিমিয়াম আয় করেছে ১১ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা, যা আগের বছর ২০২৩ সালে ছিল ১১ হাজার ৫১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে জীবনবিমা খাতে প্রিমিয়াম আয় কমেছে ১২১ কোটি টাকা।
ঢাকা ক্লাবে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিমা কোম্পানিগুলোর মালিকদের সংগঠন বিআইএর ৩৮তম বার্ষিক সাধারণ সভায় এ তথ্য জানানো হয়।
জীবনবিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিমা দাবি পরিশোধের সক্ষমতা অনেকাংশেই নির্ভর করে তাদের জীবন তহবিলের ওপর। বিআইএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে জীবন বিমা খাতের জীবন তহবিল ছিল ৩১ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ২৩২ কোটি টাকা।
জীবন তহবিল হলো জীবনবিমা কোম্পানির বিশেষ তহবিল। জীবনবিমা পলিসি থেকে সংগৃহীত প্রিমিয়াম এবং বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করা অর্থ থেকে অর্জিত আয় দিয়ে এই তহবিল গঠন করা হয়। পলিসিধারীর মৃত্যু অথবা পলিসির মেয়াদপূর্তিতে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ করা হয় এই তহবিল থেকেই। প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্তপত্রে (ব্যালান্স শিট) জীবন তহবিলকে দায় হিসেবে দেখানো হয়।
বিআইএর তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে জীবনবিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ ছিল ৩৩ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। একই সময়ে সব কোম্পানির মোট সম্পদও প্রায় ১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা বেড়েছে।
-গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিই। আমাদের অভিজ্ঞতা হলো একটি দাবি পরিশোধ করলে ১০ জন নতুন গ্রাহক পলিসি করার জন্য এগিয়ে আসেন।
তবে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে নন-লাইফ বা সাধারণ বিমা খাতে। ২০২৪ সালে ৪৬টি নন-লাইফ বিমা প্রতিষ্ঠানের মোট প্রিমিয়াম আয় আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৩ সালে এ খাতের মোট প্রিমিয়াম আয় ছিল ৪ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালে বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা। তবে একই সময়ে নন-লাইফ বিমা খাতে বিনিয়োগ কমেছে ১৫৮ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে এ খাতে বিনিয়োগ ছিল ৫ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালে কমে ৫ হাজার ৬১৪ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
জীবনবিমা খাতে প্রিমিয়াম আয় কমার কারণ জানতে চাইলে প্রগতি লাইফ ইনস্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা জালালুল আজিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিমা দাবি পরিশোধে গড়িমসি থাকলে বাজার সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য। আশা করছি, বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা সফল হলে বিমা খাত ঘুরে দাঁড়াবে। ঝুঁকিপূর্ণ, মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ ও ভালো কোম্পানিগুলোকে চিহ্নিত করেছে আইডিআরএ। ব্যাংক খাতের মতো যদি বিমা খাতেও রেজল্যুশন অধ্যাদেশ জারি হতো তাহলে বিমা খাত বেঁচে যেত।’ ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন পলিসি বিক্রির সুযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ করাও জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
প্রিমিয়াম আয়ে কারা এগিয়ে
বিআইএর বার্ষিক সভায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৩৬টি জীবনবিমা কোম্পানির মধ্যে প্রিমিয়াম আয়ে সবার শীর্ষে ছিল বিদেশি প্রতিষ্ঠান মেটলাইফ। বাংলাদেশে ১৯৫৫ সাল থেকে কার্যক্রম চালানো এই মার্কিন কোম্পানির প্রিমিয়াম আয় হয়েছে ৩ হাজার ৩১০ কোটি টাকা।
দেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ন্যাশনাল লাইফ, যার প্রিমিয়াম আয় ২ হাজার ১০৬ কোটি টাকা। অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে ডেল্টা লাইফ ৯৫৩ কোটি, জীবন বীমা করপোরেশন ৮৯৭ কোটি, প্রগতি লাইফ ৫৮২ কোটি, পপুলার লাইফ ৫৩১ কোটি, প্রাইম লাইফ ৩৮১ কোটি, মেঘনা লাইফ ৩৩৬ কোটি, সন্ধানী লাইফ ২৪৪ কোটি ও রূপালী লাইফ ইনস্যুরেন্স ২১৯ কোটি টাকার প্রিমিয়াম পেয়েছে।
-কিছু প্রতিষ্ঠানের জীবন তহবিলে কোনো অর্থ নেই।
-দাবি পরিশোধের হার কমেছে প্রায় ৮ শতাংশ।
-প্রিমিয়াম আয় কমেছে ১২১ কোটি টাকা।
-দাবি পরিশোধের পুরোভাগে মেটলাইফ ও ন্যাশনাল লাইফ।
এই শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এক বছরে প্রিমিয়াম আয় বেড়েছে মেটলাইফ, ন্যাশনাল লাইফ, ডেল্টা লাইফ, জীবন বীমা করপোরেশন, প্রগতি লাইফ ও সন্ধানী লাইফের। আর কমেছে পপুলার লাইফ, মেঘনা লাইফ, প্রাইম ইসলামি লাইফ ও রূপালী লাইফের।
ন্যাশনাল লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কাজিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিই। আমাদের অভিজ্ঞতা হলো একটি দাবি পরিশোধ করলে ১০ জন নতুন গ্রাহক পলিসি করার জন্য এগিয়ে আসেন।’
মো. কাজিম উদ্দিন আরও জানান, পাঁচ বছরের ব্যবধানে ন্যাশনাল লাইফের প্রিমিয়াম আয় দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। ২০১৯ সালে যেখানে প্রিমিয়াম আয় ছিল ১ হাজার ৭৮ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১০৬ কোটি টাকায়।
দাবি পরিশোধে কারা পিছিয়ে
২০২৪ সালে বিমা দাবি পরিশোধের হার কমেছে ৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ। ২০২৩ সালে যেখানে দাবি পরিশোধ করা হয়েছিল ৯ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৪ সালে তা কমে হয়েছে ৮ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২২ সালে দাবি পরিশোধের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
সর্বোচ্চ ২ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকার বিমা দাবি পরিশোধ করেছে মেটলাইফ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ন্যাশনাল লাইফ পরিশোধ করেছে ১ হাজার ২০৪ কোটি টাকা।
৩৬টি জীবনবিমা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭টিরই দাবি পরিশোধের হার নেতিবাচক। এর মধ্যে ফারইস্ট লাইফ, শান্তা লাইফ, হোমল্যান্ড লাইফ, প্রোগ্রেসিভ লাইফ, গোল্ডেন লাইফ, বায়রা লাইফ ও স্বদেশ লাইফের দাবি পরিশোধের হার নামমাত্র। ১০টি প্রতিষ্ঠানের দাবি পরিশোধের পরিমাণ ১ থেকে ১০ কোটি টাকার মধ্যে সীমিত। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকটির জীবন তহবিলে কোনো অর্থ নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের শিক্ষক মাইন উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘জীবনবিমা খাতে প্রিমিয়াম আয় কমে যাওয়ার অর্থ হলো এ বছর বেশি পলিসি তামাদি হয়েছে। বিনিয়োগ ও সম্পদের সঙ্গে প্রিমিয়াম আয়ের সরাসরি সম্পর্ক নেই, সম্পর্ক রয়েছে দাবি পরিশোধের হারের সঙ্গে। দাবি পরিশোধের হার কমে গেলে মানুষ নতুন করে পলিসি করতে আগ্রহী হন না। জীবনবিমাসহ পুরো বিমা খাতের স্বার্থে আইডিআরএর আরও তৎপর হওয়া প্রয়োজন।’