বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কার্ডের বাজারকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? এখানে সম্ভাবনা কেমন দেখছেন?
সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল: বিশ্ববাজারে কার্ড এখন পেমেন্ট অবকাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। মাস্টারকার্ড বর্তমানে ২১০টির বেশি দেশে সেবা দিচ্ছে। সেই তুলনায় বাংলাদেশ এখনো পরিপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছায়নি, তবে আমাদের অগ্রগতির গতি বেশ স্পষ্ট। বর্তমানে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের ইস্যু উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। বিশেষ করে গত বছর ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ট্যাক্স রিটার্ন জমার শর্ত প্রত্যাহার করায় গ্রাহকদের জন্য কার্ড গ্রহণ অনেক সহজ হয়েছে। কার্ডকে যদি দৈনন্দিন পেমেন্টের প্রধান মাধ্যম করা যায়, তবে অর্থনীতি নতুন উচ্চতায় যাবে। সরকারের ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগগুলোকে একটি ইউনিফাইড পেমেন্ট ও আইডি কার্ডের আওতায় এনে ‘ওপেন-লুপ’ ব্যবস্থায় রূপান্তর করা সম্ভব।
মাস্টারকার্ড শুধু ব্যাংকগুলোর সঙ্গে পার্টনারশিপের বাইরে ক্যাশলেস পেমেন্ট বাড়াতে আর কী ভূমিকা রাখছে?
সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল: আমাদের ভূমিকা এখন কেবল প্রযুক্তি সরবরাহে সীমাবদ্ধ নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম তৈরিতে কাজ করছি। দেশের ২৫টি ব্যাংক ও বহু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলে ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কাজ করছি। গার্মেন্টস কর্মীদের পে-রোল, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পেমেন্ট টুল এবং ফ্রিল্যান্সারদের বৈদেশিক আয় ব্যবস্থাপনায় আমরা বিশেষায়িত কার্ড ও গেটওয়ে সুবিধা দিচ্ছি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো প্রযুক্তি ও আস্থাকে এমনভাবে একীভূত করা, যাতে প্রান্তিক সবজি বিক্রেতা থেকে শুরু করে সবাই ডিজিটাল পেমেন্টে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিমালার সঙ্গে আপনারা কীভাবে খাপ খাইয়ে নিচ্ছেন? এ ক্ষেত্রে কোনো চ্যালেঞ্জ আছে কি?
সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল: ডিজিটাল লেনদেন ত্বরান্বিত করতে তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা ও সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। ডিজিটাল পেমেন্টকে জনপ্রিয় করতে প্রয়োজন আগামী তিন বছরের জন্য একটি বিশেষ প্রণোদনা কাঠামো করা। যেখানে গ্রাহকদের জন্য ৩ শতাংশ এবং মার্চেন্টদের জন্য ২ শতাংশ—মোট ৫ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া স্মার্ট কার্ডের ওপর বর্তমানে ৭৬ শতাংশ এবং পস মেশিনের ওপর ৩৮ থেকে ৫৮ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ শুল্ক রয়েছে। এটি কমিয়ে ১৫ শতাংশের নিচে আনা জরুরি। শুল্ক কমলে ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হলে ডিজিটাল পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী হবে।
সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় মাস্টারকার্ডের সর্বশেষ প্রযুক্তিগুলো বাংলাদেশে কীভাবে কাজ করছে?
সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল: আমরা নিরাপত্তায় বিশ্বমানের প্রযুক্তি ও মানদণ্ড অনুসরণ করি। আমাদের ‘ডিসিশন ইন্টেলিজেন্স প্রো’ জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে এক ট্রিলিয়নের বেশি ডেটা পয়েন্ট বিশ্লেষণ করতে পারে, যা জালিয়াতি শনাক্তে অত্যন্ত কার্যকর। অনলাইনে অথেনটিকেশনের জন্য আমরা ইএমভি থ্রি-ডিএস স্ট্যান্ডার্ড ব্যবহার করি। এ ছাড়া বায়োমেট্রিক মেটাল ক্রেডিট কার্ডে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে কিউআর পেমেন্ট পৌঁছানোর প্রধান বাধাগুলো কী?
সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল: এখানে প্রধান বাধা তিনটি—স্থানান্তরের খরচ, প্রযুক্তিগত সমন্বয় ও সচেতনতা। দেশের জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক ‘বাংলা কিউআর’ বাধ্যতামূলক করেছে, কিন্তু বড় এমএফএস কোম্পানিগুলোর লাখ লাখ মার্চেন্ট পয়েন্টকে এই ইউনিফাইড সিস্টেমে আনা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। এই বাধা কাটাতে সাশ্রয়ী পেমেন্ট ডিভাইস ও গ্রাহক-মার্চেন্ট উভয়ের জন্য সেই ৫ শতাংশ প্রণোদনার কোনো বিকল্প নেই।
স্মার্ট ইকোনমি তৈরিতে প্রিপেইড কার্ডের ভবিষ্যৎ কেমন দেখছেন?
সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল: প্রিপেইড কার্ড এখন সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ক্যাটাগরি। চলতি বছরে আমাদের স্টিকার কার্ড ও নম্বরলেস কার্ড বাজারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। গার্মেন্টস খাতের ৪৫ লাখ কর্মীর স্যালারি কার্ডের মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদার হয়েছে। এ ছাড়া ট্রাভেল, মেডিক্যাল ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বহুমুখী প্রিপেইড সলিউশন আমাদের অর্থনীতির একটি বড় শক্তিতে পরিণত হচ্ছে।