ব্যাংক কোনো রাজনৈতিক দলের হবে না

জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকদের সংগঠন ‘সম্পাদক পরিষদ’-এর নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান (বাঁ থেকে প্রথম)। আজ সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়েছবি: বাংলাদেশ ব্যাংক

ব্যাংক কোনো রাজনৈতিক দলের হবে না। তবে ব্যাংকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থক থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেছেন, বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যে ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে এবং তা দ্রুতই দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে অর্থঋণ আদালত আইনের সংস্কার এবং আদায় অযোগ্য ঋণ নিষ্পত্তির জন্য নতুন আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। গভর্নর বলেন, ব্যাংকের পরিচালনা ও ঋণ বিতরণে পেশাদারি, জবাবদিহি এবং সুশাসন নিশ্চিত করা বর্তমান সংস্কার কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আজ সোমবার জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকদের সংগঠন ‘সম্পাদক পরিষদ’–এর নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকারে গভর্নর এ কথা বলেন। আলোচনায় সম্পাদকদের পক্ষ থেকে অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের বিভিন্ন বিষয়ে গভর্নরের কাছে জানতে চাওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সম্পাদকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি জানানো হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের সবাই স্বায়ত্তশাসন চায়।

বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ব্যাংকিং খাতের চলমান সংস্কার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সার্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার বিষয়ে সম্পাদকদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলো একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কে সম্পাদকদের অবহিত করেন গভর্নর। এ সময় গভর্নর জানান, এ প্রক্রিয়ায় ইতিমধ্যে কিছু প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনামূলক পরিবর্তন সম্পন্ন হয়েছে। ব্যাংকগুলোর কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সমন্বয় সম্পন্ন হওয়ার পর পুনর্গঠন কার্যক্রম আরও গতি পাবে।

এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি বৃহৎ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বৈঠকে তুলে ধরেন গভর্নর।

ব্যাংকিং খাতের ডিজিটাল রূপান্তর ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বিষয়ে গভর্নর জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সমন্বিত ডিজিটাল আর্থিক ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে কাজ করছে, যার আওতায় ডিজিটাল ন্যানো ঋণব্যবস্থা, এআইভিত্তিক ঋণ মূল্যায়ন এবং ক্রেডিট ব্যুরোর অনুমোদন বিষয়ে কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

* বিদেশে জব্দ অর্থ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের কথা জানান গভর্নর।
* বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে, জানতে চান সম্পাদকেরা।
* দুর্বল ব্যাংকগুলো একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কে সম্পাদকদের অবহিত করেন গভর্নর।
* খেলাপি ঋণের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে অর্থঋণ আদালত আইনের সংস্কারে কাজ চলছে।

গভর্নর বলেন, ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডেন্টিটি, ওয়ান ওয়ালেট’ ধারণার মাধ্যমে দেশের ডিজিটাল রূপান্তরব্যবস্থা দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হবে। এ ছাড়া বাংলাকিউআরের মাধ্যমে নগদ টাকার ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন নিশ্চিত করা এবং গ্রাহকের লেনদেন রিপোর্টিং সিস্টেমে আনার মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করা সম্ভব।

দেশে চিকিৎসার ক্ষেত্রে অনুমোদিত পরিমাণের অধিক ডলারের প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে আবেদন সাপেক্ষে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদন দিচ্ছে বলেও সম্পাদকদের বৈঠকে জানান গভর্নর। পাশাপাশি ইউপাসের ক্ষেত্রে বিল ডিসকাউন্টিংয়ের জন্য ব্যবহৃত ফান্ডের সুদের হার হ্রাস করা হয়েছে, যা আমদানি করা পণ্যের মূল্যহ্রাসে সহায়ক হবে।

সভা সূত্রে জানা যায়, গভর্নর বলেন, ব্যাংক একীভূত কার্যক্রম চলবে। রাজনৈতিক চাপ এলে তা মোকাবিলা করার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বন্ধ কারখানা চালুর জন্য ঘোষিত ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে আগে ভালো গ্রাহকেরা ঋণ পাবেন। ব্যাংক খাতে স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা বাড়ানোরও চেষ্টা চলছে। সভায় গভর্নর আরও বলেন, ব্যাংকের সুদহার হঠাৎ করে কমানো যাবে না। এ জন্য সময় লাগবে। এ ছাড়া ডলারের দাম নির্ধারণ হবে বাজারের মাধ্যমে।

সভায় সম্পাদক পরিষদের সদস্যরা ব্যাংকিং খাতের টেকসই উন্নয়নে বিভিন্ন গঠনমূলক মতামত দেন। দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় উভয় পক্ষ পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন বলে জানানো হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে।

আলোচনা শেষে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীর বলেন, ‘বাজেটের আগে আমরা দেশের অর্থনীতির সর্বশেষ অবস্থা জানতে এসেছিলাম। মানুষের মধ্যে অনেক দুশ্চিন্তা আছে। কর্মসংস্থানের সমস্যা আছে। আবার আন্দোলন–সংগ্রামের মধ্যে আছে কিছু বিষয়। খেলাপি ঋণগুলোর কী অবস্থা। এসব তাঁরা জানিয়েছেন, আমরাও কিছু বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম। সম্পাদকেরা কিছু বিষয়ে তাঁদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকও সম্পাদকদের কাছ থেকে কিছু পরামর্শ চেয়েছে। মূলত পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে ব্যাংক খাত কীভাবে চলছে, তা বোঝা এবং সাধারণ মানুষের উদ্বেগগুলো তুলে ধরায় ছিল এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য।’

ব্যাংক খাত নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে কী কী ছিল—জানতে চাইলে নূরুল কবীর বলেন, ‘আমানতকারীদের টাকা ফেরত পাওয়ার কী হবে, ব্যাংক একীভূতকরণের কী হবে—এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা জানতে চেয়েছিলাম আমরা। ইসলামী ব্যাংককে আরও কীভাবে শক্তিশালী করে গড়ে তোলা যায়, সে বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে।’

বৈঠক শেষে সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা কিছু বিষয়ে বলেছি, ওনারা কিছু বিষয় জানিয়েছেন। এটা একধরনের তথ্য বিনিময়ের মতো। ব্যাংক হলো এমন একটি খাত, যা দেশের অর্থনীতির একটা বার্তা দেয়। এটা দেশে–বিদেশে সবখানেই। আস্থা তৈরি, বেসরকারি খাত ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্যাংক খাত একটা বড় বার্তা দেয়। ব্যাংক কোম্পানি আইন যেটা পাস হয়েছে, সেটা নিয়ে আমরা কথা বলেছি। পুরোনোদের কাছে ব্যাংক ফেরত যাবে কি না—জানতে চেয়েছিলাম। বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে তাদের অবস্থানের কথা আমাদের জানিয়েছে।’

বৈঠকে সম্পাদকদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, মানবজমিন–এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীন, সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী ও আগামীর সময় সম্পাদক মোস্তফা মামুন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে বৈঠকে গভর্নর ছাড়াও ডেপুটি গভর্নররাসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠক চলে।