এ অবস্থায় করণীয় বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘মূলত ডলার-সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো ঋণপত্র খোলা কমিয়ে দিয়েছে। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক খাদ্যপণ্য, কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য আমদানিতে তিন থেকে ছয় মাস মেয়াদে ডলারে ঋণ দিতে পারে। এতে আপাতত সংকট হয়তো কিছুটা মিটবে। ব্যাংকগুলোও ডলার সংগ্রহে মনোযোগ বাড়াবে। কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ডলারে ঋণ নিয়ে কোনো ব্যাংক খেলাপি হতে চাইবে না।’

সালেহউদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, ‘প্রবাসী আয়ে ডলারের যে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, তা আরও চার-পাঁচ টাকা বাড়ানো যেতে পারে। এতে বৈধ পথে আয় কিছুটা বাড়তে পারে। পাশাপাশি প্রবাসী আয় আসার প্রক্রিয়া আরও সহজ করা দরকার।’

সংকট যে কারণে

দেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরু হয় ২০২০ সালের মার্চে। এ সময় অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য সচল রাখতে নানা ধরনের ছাড় দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আমদানি দায় পরিশোধের সময় ১৮০ দিন থেকে বাড়িয়ে ৩৬০ দিন করা হয়। আবার রপ্তানি আয় দেশে আনতেও বাড়তি সময় দেওয়া হয়।

ফলে অনেক আমদানি দায় অপরিশোধিত থেকে যায়। আবার অনেক রপ্তানি আয় দেশে আসেনি। তবে করোনাকালে বৈধ পথে প্রবাসী আয় আসায় নতুন নতুন রেকর্ড হয়। তাতে রিজার্ভ পৌঁছে যায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড উচ্চতায়। করোনাকালে বিশ্বের অনেক দেশ স্থানীয় মুদ্রার অবনমন করলেও বাংলাদেশ ব্যাংক কৃত্রিমভাবে ডলারের বিপরীতে টাকার মান ধরে রাখে।

বর্তমানে ব্যাংকের যে পরিমাণ ডলার আয় হচ্ছে, তার বেশি কেউ ঋণপত্র খুলছে না। এটাই স্বাভাবিক।
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো আমদানি খরচ (জাহাজভাড়াসহ) ৮ বিলিয়ন বা ৮০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়। আর গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে সেই খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ৮৩২ কোটি ডলারে।

গত ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায় অস্বাভাবিকভাবে। ফলে আমদানি খরচ আর কমেনি। অন্যদিকে রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ও বাড়েনি। ফলে দেশে ডলার-সংকট প্রকট হয়ে ওঠে।

প্রতি মাসে যে পরিমাণ রপ্তানি হয়, তার পুরোটা প্রত্যাবাসন হয় না। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চে ১ হাজার ৩৯০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হলেও এ সময় দেশে এসেছে ১ হাজার ১৩৪ কোটি ডলার। আর মার্চ থেকে জুন প্রান্তিকে ১ হাজার ৩৫৮ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হলেও দেশে এসেছে ১ হাজার ১৯৮ কোটি ডলার। সেই হিসাবে ছয় মাসে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের রপ্তানি আয় আটকে থাকে। নিয়ম অনুযায়ী, পণ্য জাহাজিকরণের ১২০ দিনের মধ্যে রপ্তানি আয় দেশে আনতে হয়।

দেশে যে ডলার খরচ হয়, তা শুধু আমদানিতে খরচ হয় না। সরকারি-বেসরকারি বিদেশি ঋণ পরিশোধ, প্রযুক্তিসেবা, বিমান কোম্পানিগুলোর মুনাফা প্রত্যাবাসন, শিক্ষা-চিকিৎসা খরচসহ আরও নানা প্রয়োজনে ডলার লাগে। এ জন্য মাসে প্রয়োজন হয় ১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।

১৫ মাসে বিক্রি ১২ বিলিয়ন ডলার

করোনার সময় রেকর্ড প্রবাসী আয় দেশে আসে। তাতে ডলারের দাম ধরে রাখতে ২০২০-২১ অর্থবছরে বাজার থেকে প্রায় ৮০০ কোটি ডলার কিনে নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপর ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত রিজার্ভ থেকে ৭৬২ কোটি ডলার বিক্রি করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এই ধারা অব্যাহত আছে চলতি অর্থবছরও। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সব মিলিয়ে গত ১৫ মাসে রিজার্ভ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ১ হাজার ২০০ কোটি বা ১২ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে। এতে রিজার্ভ কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪২৫ কোটি ডলারে। গত বছরের আগস্টে রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলারে উঠেছিল। রিজার্ভে টান পড়ায় এখন বেসরকারি খাতে কোনো ডলার বিক্রি করছে না বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে রিজার্ভ এখন ৩ হাজার ৪২৫ কোটি ডলার হলেও প্রকৃত রিজার্ভ ২৬ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের কিছু বেশি। কারণ, রিজার্ভ থেকে প্রায় ৮০০ কোটি ডলার বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করা আইএমএফের প্রতিনিধিদল রিজার্ভ হিসাবের ক্ষেত্রে প্রকৃত তথ্য প্রকাশের সুপারিশ করে। তাতে সম্মত হয় বাংলাদেশ ব্যাংকও।

ডলারের উৎসেও ভাটা

ব্যাংকগুলোতে ডলারের সংকট এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। ফলে অর্ধেকের বেশি ব্যাংক দৈনিক কার্যক্রম শুরু করছে ডলারশূন্য অবস্থায়। এ কারণে যাদের রপ্তানি আয় আছে, কেবল তারাই আমদানির ঋণপত্র খোলার সুযোগ পাচ্ছে। অনেক ব্যাংক ডলার-সংকটে বিদেশি ব্যাংকের দায় পরিশোধও পিছিয়ে দিচ্ছে। ইতিমধ্যে দেশের ব্যাংকগুলোর জন্য ডলার ব্যবহারের সীমা কমিয়ে দিয়েছে বিদেশি ব্যাংকগুলো।

গত বুধবার বেসরকারি একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ২ লাখ ডলারের তুলা আমদানির জন্য প্রথম প্রজন্মের একটি ব্যাংকে ঋণপত্র খোলার জন্য কয়েক দিন ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই ঋণপত্র খুলতে পারেননি। তিনি জানান, ‘জ্বালানি, সার আমদানি ছাড়া অন্য ঋণপত্র খোলা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।’

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা উদ্যোগের ফলে গত অক্টোবরে আমদানির ঋণপত্র খোলা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫০ কোটি ডলারের (সাড়ে ৪ বিলিয়ন) কম। ফলে ডলারের যে সংকট চলছে, তা আগামী বছরের শুরুতে কেটে যাবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জি এম আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি হলো, ব্যাংক যে ডলার আয় করবে, তার সমপরিমাণ ঋণপত্র খুলতে পারবে। আমদানি নিয়ন্ত্রণের জন্য ৩০ লাখ ডলারের বেশি ঋণপত্র খোলার বিষয়ে তদারকি অব্যাহত রয়েছে। আর সরকারি জ্বালানি, খাদ্য ও সার আমদানিতে ডলার সহায়তা অব্যাহত থাকবে।

ডলারের বড় উৎস প্রবাসী ও রপ্তানি আয়। খোলাবাজারের তুলনায় ব্যাংকে ডলারের দাম কম বলে এখন বৈধ পথে ডলার আসা কমে গেছে। আবার ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় রপ্তানি বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে কমছে রপ্তানি।

তৃতীয় প্রজন্মের একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, প্রবাসী আয়ে ডলারের দামের সীমা তুলে দিলে সংকট কিছুটা হলেও কমতে পারে।

এখন ব্যাংকগুলো জোটবদ্ধ হয়ে প্রবাসী আয়ে ডলারের সর্বোচ্চ দাম দিচ্ছে ১০৭ টাকা। আর রপ্তানি আয় নগদায়নে প্রতি ডলারের দাম ধরা হচ্ছে ১০০ টাকা।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে ব্যাংকের যে পরিমাণ ডলার আয় হচ্ছে, তার বেশি কেউ ঋণপত্র খুলছে না। এটাই স্বাভাবিক।

কারণ, কোনো ব্যাংক বিদেশি ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হতে চাইবে না। এই সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলো ঋণের সীমাও বাড়াচ্ছে না। ফলে ডলারের উৎসগুলো সীমিত হয়ে পড়েছে।