গৃহনির্মাণ ও আবাসন ঋণের সুদ নিজেরাই নির্ধারণ করতে পারবে হাউস বিল্ডিং ফিন্যান্স

বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের (বিএইচবিএফসি) লোগোছবি: সংগৃহিত

সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফিন্যান্স করপোরেশনের (বিএইচবিএফসি) ঋণের সুদহার নির্ধারণে এখন আর সরকারের অনুমোদন নিতে হবে না। সংস্থাটি নিজেই সুদহার নির্ধারণ করতে পারবে। পাশাপাশি সরকারকে প্রতিবছর কী পরিমাণ মুনাফা দেবে, তা-ও ঠিক করতে পারবে বিএইচবিএফসি। আইন সংশোধন করে এসব বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এত দিন প্রতিষ্ঠানটির ঋণের সুদহার নির্ধারণ করে দিত অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।

উপদেষ্টা পরিষদ গত বৃহস্পতিবার ‘দ্য বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফিন্যান্স করপোরেশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ অনুমোদন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বাড়াতে অধ্যাদেশে নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিএইচবিএফসি তুলনামূলক কম সুদে গৃহনির্মাণ ও আবাসন ঋণ দেয়, যা বর্তমানে ৮ থেকে ১০ শতাংশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এত দিন সরকারকে লভ্যাংশ হিসেবে বিএইচবিএফসির নিট মুনাফার পুরোটা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। এখন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ মুনাফার পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারবে। ফলে মুনাফার যে অর্থ প্রতিষ্ঠানটির হাতে থাকবে, তা অবণ্টিত মুনাফা হিসেবে (রিটেইন্ড আর্নিং) সংস্থাটি নিজের কাছে রেখে দেবে, যাতে সেই অর্থে গ্রাহকদের আরও বেশি ঋণ দেওয়া যায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, অধ্যাদেশটি অনুমোদিত হওয়ায় বিএইচবিএফসি আরও শক্তিশালী হবে এবং আরও বেশি মানুষ প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ঋণসেবা পাবেন।

দেশের নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষকে গৃহনির্মাণ ও আবাসনে ঋণ দিতে ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশে গঠিত হয় বিএইচবিএফসি। অবশ্য স্বাধীনতার আগে থেকেই সাত দশকের বেশি সময় ধরে পরিকল্পিত আবাসন বিনির্মাণে ঋণ দিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে সারা দেশে ৭৩টি শাখা কার্যালয়ের মাধ্যমে ঋণ দিচ্ছে সংস্থাটি। দেশের নগর ও মহানগর অঞ্চলের বাইরে সব উপজেলা এবং গুরুত্বপূর্ণ গ্রোথ সেন্টারগুলোতে প্রতিষ্ঠানটির ঋণ কার্যক্রম রয়েছে।

অধ্যাদেশ সংশোধনের বিষয়ে উপদেষ্টা পরিষদকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ জানিয়েছে, ব্যাংক বা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম সুদে ঋণ দেয় বিএইচবিএফসি। তাই এ প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়ার চাহিদা অনেক বেশি। অথচ সরকারের দেওয়া ঋণ ও মূলধন সহায়তা ছাড়া এ সংস্থার তহবিলের অন্য কোনো উৎস নেই। তাই প্রতিষ্ঠানটির তহবিল-সংকট দূর করতে এ প্রস্তাব করা হয়েছে।

বর্তমানে ঋণের সুদের হার সরকারের মাধ্যমে নির্ধারণের বিধান রয়েছে জানিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বলেছে, তফসিলভুক্ত ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুসরণ করে বিএইচবিএফসির ঋণের সুদের হার পর্ষদ নির্ধারণ করবে। এ প্রস্তাবও অনুমোদিত হয়েছে।

হামিদুল হক নামের বিএইচএফসি থেকে গৃহঋণ নিতে আগ্রহী একজন গ্রাহক প্রথম আলোকে বলেন, বিএইচবিএফসি ঋণের সুদের হার ঠিক করার এখতিয়ার পাচ্ছে ভালো কথা, কিন্তু সংস্থাটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তা যেন না করে।

বিএইচবিএফসি এ পর্যন্ত ১২ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। ঋণের সুবিধাভোগী ১০ লাখ ৫১ হাজার গ্রাহক। সংস্থাটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে জানিয়েছে, তারা কোনো ঋণ অবলোপন করেনি, মওকুফও করেনি এবং খেলাপি ঋণের হার এখন ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির কোনো প্রভিশন ও মূলধন-ঘাটতি নেই। প্রচলিত ঋণের পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক ঋণ–সুবিধাও রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিলে তা ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে পরিশোধের সুযোগ রয়েছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে বিএইচবিএফসি জানিয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮৪৬ কোটি টাকার ঋণ মঞ্জুর করেছে তারা। তবে ঋণ দিয়েছে ৬৯৬ কোটি টাকা। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ হাজার ২৮৯ কোটি টাকার মঞ্জুর করা হলেও ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ৯১৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকার ঋণ মঞ্জুরির বিপরীতে বিতরণ করা হয় ৯২২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ওই অর্থবছরে টাকার অভাবে মঞ্জুরের পরও ৪১২ কোটি টাকার ঋণ দিতে পারেনি বিএইচবিএফসি।

-অধ্যাদেশটি অনুমোদিত হওয়ায় বিএইচবিএফসি আরও শক্তিশালী হবে এবং আরও বেশি মানুষ প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ঋণসেবা পাবেন।
নাজমা মোবারেক, সচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।

বিএইচবিএফসি ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সব ধরনের ঋণের সুদ ১ শতাংশ করে বাড়িয়ে ৮ থেকে ১০ শতাংশ করেছিল, যা বর্তমানেও বহাল আছে। ১১ ধরনের গৃহঋণ দেয় বিএইচবিএফসি। এসব ঋণের মধ্যে রয়েছে নগর বন্ধু, পল্লীমা, আবাসন উন্নয়ন, আবাসন মেরামত, প্রবাস বন্ধু, হাউজিং ইকুইপমেন্ট ঋণ, কৃষক আবাসন ঋণ, সরকারি কর্মচারী ঋণ, ফ্ল্যাট ঋণ, ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন ঋণ এবং স্বপ্ননীড় ঋণ।

এদিকে ‘দ্য বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফিন্যান্স করপোরেশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদন হওয়ায় কিছুদিনের মধ্যেই তা গেজেট আকারে জারি হবে। এরপরই নতুন বিধানগুলো কার্যকর করা হবে।

বিএইচবিএফসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা যা যা চেয়েছিলাম, সবই আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ উপদেষ্টা পরিষদে উপস্থাপন করেছে এবং উপদেষ্টা পরিষদ তা অনুমোদন করেছে। এখন আমাদের আগের চেয়ে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে।’