শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাবে ইসলামী ব্যাংক শীর্ষে, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক দ্বিতীয়

* মোট শিক্ষার্থী ব্যাংক হিসাব প্রায় ৬৩ লাখ।
* মোট আমানত প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার।
* শহর এলাকায় শিক্ষার্থী হিসাব ৫৬%
* ছেলেদের ব্যাংক হিসাব ৫৩%, মেয়ে ৪৭%
* সম্প্রতি বয়সসীমা বাড়িয়ে ২৫ বছর করায় শিক্ষার্থী ব্যাংক হিসাব খোলা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক

একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাফসান আহমেদ সম্প্রতি বেসরকারি একটি ব্যাংকে সঞ্চয়ী হিসাব খোলে। মাধ্যমিক পরীক্ষায় এ-প্লাস পাওয়ায় রাফসানকে ওই ব্যাংক থেকে মাসিক বৃত্তি দেওয়া হয়। মূলত এই বৃত্তির টাকা জমাতেই সে ব্যাংক হিসাব খুলেছে।

রাফসান আহমেদের মতো দেশের অর্ধকোটি শিক্ষার্থীর বর্তমানে ব্যাংক হিসাব রয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের মধে৵ ব্যাংক হিসাব খোলার পরিমাণ বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে টাকা জমা অর্থাৎ আমানতের পরিমাণও।‘ স্কুল ব্যাংকিং’ বা ‘স্টুডেন্ট ব্যাংকিং’ নামে পরিচিত এ খাতে হিসাব খোলা ও আমানত সংগ্রহের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ; আর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বিভাগের সর্বশেষ জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, দেশে ব্যাংকসহ অনেক প্রতিষ্ঠান প্রতিবছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থীকে বৃত্তি ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। বেশির ভাগ শিক্ষার্থী ব্যাংকিং মাধ্যমে বৃত্তির অর্থ পান। অন্যদিকে সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব খোলার বয়সের সীমা বাড়ানো হয়েছে। এতে শিক্ষার্থী হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে। এ ছাড়া দেশের ব্যাংকগুলোর সব শাখার অন্তত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার নীতিও শিক্ষার্থী ব্যাংক হিসাব বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

৩ হাজার কোটি টাকার আমানত

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে কাজ করা ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ৫৯টি ব্যাংকই বর্তমানে ‘স্টুডেন্ট ব্যাংকিং’ সেবা দিচ্ছে। সর্বশেষ জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিক শেষে শিক্ষার্থী ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬২ লাখ ৭৩ হাজার। এসব হিসাবে শিক্ষার্থীদের জমানো মোট আমানতের পরিমাণ ২ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। এক বছর আগে অর্থাৎ ২০২৫ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে সব ব্যাংক মিলিয়ে ৪৪ লাখ ৮০ হাজার শিক্ষার্থী ব্যাংক হিসাব ছিল। সেই হিসাবে এক বছরে শিক্ষার্থীর ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ৪০ শতাংশ বেড়েছে। একইভাবে আমানতের পরিমাণও গত বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

শীর্ষ ৫ ব্যাংক

শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাবের ৬১ শতাংশ খোলা হয়েছে শীর্ষ ৫টি ব্যাংকের মাধ্যমে। এর মধ্যে হিসাব খোলা ও আমানত সংগ্রহ—উভয় ক্ষেত্রে এককভাবে শীর্ষস্থানে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। ব্যাংকটিতে শিক্ষার্থীদের মোট হিসাবের সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ ৯৮ হাজার। ব্যাংকটিতে শিক্ষার্থীদের জমানো টাকার পরিমাণ প্রায় ৫৭৮ কোটি।

শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাবের সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। এই ব্যাংকে খোলা শিক্ষার্থীদের মোট হিসাবের সংখ্যা ১০ লাখ ৯৮ হাজার। এসব হিসাবের বিপরীতে ৪৩২ কোটি টাকার আমানত রয়েছে ব্যাংকটিতে।

বেসরকারি এই দুটি ব্যাংক ছাড়াও সোনালী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংক স্টুডেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রমে শীর্ষ পাঁচ ব্যাংকের তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকে ৫ লাখ এবং রূপালী ও অগ্রণী ব্যাংকে সাড়ে ৩ লাখের কাছাকাছি শিক্ষার্থীর ব্যাংক হিসাব রয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে শহর এলাকা ও ছেলেদের অংশগ্রহণ বেশি। মোট হিসাবের প্রায় ৫৬ শতাংশ শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এবং ৪৪ শতাংশ গ্রাম এলাকায় খোলা হয়েছে। সর্বশেষ প্রান্তিকে গ্রাম এলাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার হার ৯ শতাংশের মতো বেড়েছে, যেখানে শহর এলাকায় এই হার প্রায় ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ শহরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাংকিং–সুবিধা গ্রহণের হার বেশি।

অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের মোট ব্যাংক হিসাবের মধ্যে ৫৩ শতাংশ ছেলেদের; বাকি প্রায় ৪৭ শতাংশ হিসাব মেয়ে শিক্ষার্থীদের। আমানত জমার ক্ষেত্রেও ছেলেরা এগিয়ে। ছেলে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাবে রয়েছে মোট আমানতের ৫৭ শতাংশ। বাকি ৪৩ শতাংশ আমানত নারী শিক্ষার্থীদের।

যে কারণে ব্যাংক হিসাব বেড়েছে

চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক স্কুল ব্যাংকিংয়ের নতুন নির্দেশনা জারি করে। এতে শিক্ষার্থী ব্যাংক হিসাব খোলার বয়সসীমা বাড়িয়ে ২৫ বছর করা হয়। নতুন এই নির্দেশনা জারির ফলে প্রথম প্রান্তিকেই ১৩ লাখ ৪২ হাজার শিক্ষার্থী নতুন করে ব্যাংক হিসাবে যুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি এ–সংক্রান্ত নীতিমালা জারি করে। সেখানে বলা হয়, সারা দেশে ব্যাংকের প্রতিটি শাখা তার আশপাশের অন্তত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকিং সুবিধা দেবে। হিসাব খোলার ক্ষেত্রে এই নির্দেশনারও ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে বলে মনে করেন ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

শিক্ষার্থীর ব্যাংক হিসাবের সুবিধা

মূলত অল্প বয়স থেকেই সঞ্চয়ের অভ্যাস ও আর্থিক সচেতনতা গড়ে তুলতে ‘শিক্ষার্থী ব্যাংক হিসাব’ চালুর উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, শিক্ষার্থী ব্যাংক হিসাব পরিচালনা অত্যন্ত সাশ্রয়ী। কোনো প্রকার সার্ভিস চার্জ বা মাশুল ছাড়াই মাত্র ১০০ টাকা জমা দিয়ে এই হিসাব খোলা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত লেনদেনের সীমা সাপেক্ষে এতে ডেবিট কার্ড এবং এসএমএস, ইন্টারনেট ও মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা দেওয়া হয়।

রেদোয়ান ইসলাম নামের একজন অভিভাবক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার সন্তানের বয়স সাত বছর। পাঁচ বছর বয়সেই তার নামে একটি ব্যাংক হিসাব খুলি। এই হিসাবে সন্তানের জন্য প্রতি মাসে কিছু অর্থ সঞ্চয় করছি। এ ছাড়া জন্মদিনসহ বিভিন্ন উপলক্ষে সে টাকা উপহার পেলে সেগুলোও ব্যাংক হিসাবে জমা রাখি। সন্তান বড় হলে তার টাকা সে নিজে বুঝে পাবে।’