মৌলিক চাহিদা পূরণ করে এমন খাতে অর্থায়ন বাড়িয়েছে পূবালী ব্যাংক। এখন টেকসই অর্থায়নে কোন কোন খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন?
মোহাম্মদ আলী: টেকসই অর্থায়নের তিনটি প্রধান অংশ। যার একটি হচ্ছে ব্যাংকের নিজস্ব আর্থিক কাঠামো। এর মধ্যে ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিপত্র (ব্যালান্স শিট), মূলধন, তারল্য, খেলাপি প্রভৃতির অনুপাত কেমন, সেটি দেখা হয়। ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতা কতটা টেকসই, তা এসব তথ্যের মাধ্যমে বোঝা যায়। দ্বিতীয়টি হচ্ছে পরিচালনার জায়গায় ব্যাংক কতটা পরিবেশবান্ধব। যেমন ব্যাংকটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করে কি না, জ্বালানির জন্য হিউম্যান সেন্সর রয়েছে কি না প্রভৃতি বিষয়। তৃতীয় বিষয় হচ্ছে ব্যাংক যেখানে ঋণ দিচ্ছে, সেগুলো টেকসই প্রকল্প কি না।
আমাদের দেশের মানুষের পাঁচটা মৌলিক চাহিদা রয়েছে—অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা। এগুলোর পশ্চাৎ ও সম্মুখ সংযোগ খাতে আমরা কাজ করছি। পাশাপাশি আমাদের বড় একটি অগ্রাধিকার পরিবেশ নিয়ে কাজ করা। যেসব প্রকল্পে দূষণসহ পরিবেশগত ঝুঁকি একেবারেই কম, আমরা সেখানে বিনিয়োগ করছি। প্রতিষ্ঠানের গ্রিন সার্টিফিকেশন থাকলে সেটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। যেমন লিড প্লাটিনাম র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ দশটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছয়টি বাংলাদেশে অবস্থিত। এর মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠানেই পূবালী ব্যাংক অর্থায়ন করেছে।
এ ছাড়া আমরা বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ, জ্বালানিসাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি কেনাসহ বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়ন করছি। যেমন কেউ আটা–ময়দার মিলের জন্য যন্ত্রপাতি কিনবেন। সেখানে সাধারণ যন্ত্রের পরিবর্তে তিনি যদি ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করবে এমন আধুনিক যন্ত্র কেনেন, তাঁকে আমরা ঋণ দিই। এ জন্য আমরা গ্রাহকদেরও উৎসাহিত করি। সে হিসাবে আমাদের প্রায় ৮৮ শতাংশ বিনিয়োগ বা অর্থায়ন টেকসই খাতে হয়েছে। সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) থেকে গ্রিন বন্ডের জন্য ১০০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন প্রাপ্তি পাইপলাইনে রয়েছে। সব মিলিয়ে পরিবেশবান্ধব বা টেকসই অর্থায়নকে পূবালী ব্যাংক বড় অগ্রাধিকারের মধ্যে রেখেছে। উচ্চ পরিবেশগত ঝুঁকি আছে এমন কোনো প্রকল্পে আমাদের অর্থায়ন নেই, এটি আমি নিশ্চিত করতে পারি।
”পরিবেশবান্ধব বা টেকসই অর্থায়নকে পূবালী ব্যাংক বড় অগ্রাধিকারের মধ্যে রেখেছে। উচ্চ পরিবেশগত ঝুঁকি আছে, এমন কোনো প্রকল্পে আমাদের অর্থায়ন নেই, এটি আমি নিশ্চিত করতে পারি।
টেকসই ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়ন করা ঋণের আদায় পরিস্থিতি কেমন। অন্য ঋণের মতো, নাকি ভিন্নতা আছে?
মোহাম্মদ আলী: টেকসই অর্থায়নের এটা একটা ভালো দিক। যাঁরা দেশকে নিয়ে ভাবেন, তাঁরাই তো আসলে টেকসই প্রকল্প করতে চান। মনে করেন, কেউ কারখানায় পানি পরিশোধনাগার স্থাপন করলেন। এটি তাঁকে সরাসরি কোনো আয় দেবে না। কিন্তু তারপরও সেটি করছেন। কারণ, তাঁর মধ্যে একধরনের সচেতনতা আছে। অনেক গ্রাহকের মধ্যে এমন সামাজিক দায়বদ্ধতা আছে। আমরাও দেখছি, ভালো গ্রাহকেরাই এ
ধরনের প্রকল্প করতে চান। আর ভালো ও সচেতন গ্রাহকেরা ঋণ ঠিকভাবে পরিশোধ করেন। ফলে এসব জায়গায় কোনো ঋণখেলাপি নেই।
টেকসই কোর ব্যাংকিং সূচকে পূবালী ব্যাংক কেমন করছে। পরিবেশের ওপর আপনাদের উদ্যোগগুলোর প্রভাব কেমন?
মোহাম্মদ আলী: বাংলাদেশ ব্যাংক যে টেকসই কোর ব্যাংকিং সূচক তৈরি করে, তাতে দশের মধ্যে প্রথম তিন–চারের মধ্যে আমাদের অবস্থান। টেকসই অর্থায়ন নিয়ে আমাদের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা আছে। এটিরই প্রতিফলন উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই কোর ব্যাংকিং সূচকে। পরিবেশ নিয়ে আমাদের উদ্যোগগুলোর অনেক ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। পূবালী ব্যাংক কী পরিমাণ কার্বন নির্গমন করে, সেটি হিসাব করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে ২০৭০ সালের মধ্যে শূন্য কার্বন নির্গমনের কাছাকাছি যাওয়া। ইতিমধ্যে সে লক্ষ্যে কাজ শুরু হয়েছে। যেমন গত বছর আমরা সারা দেশে প্রায় ২৮ হাজার ৮০০ গাছ লাগিয়েছি। চলতি বছরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ গাছ বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা কার্বন কমাতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি আমরা যান্ত্রিকভাবে কার্বন নির্গমন কমানোর উদ্যোগ নিয়েছি। যেমন ব্যাংকের ডেটা সেন্টার, মিলনায়তন, বড় বড় কক্ষ প্রভৃতি স্থানে ইতিমধ্যে সেন্সরযুক্ত লাইট লাগানো হয়েছে, এটিএম বুথে সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে। এতে বিদ্যুতের ব্যবহার কমছে।