প্রস্তুত নন ব্যবসায়ীরা, গভর্নরের ভিন্নমত

ব্যবসায়ী সংগঠন আইসিসি বাংলাদেশ আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় এই মত–দ্বিমত উঠে আসে।

ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ (আইসিসিবি) আয়োজিত ‘এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ব্যাংকিং খাতে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরসহ বিশেষ অতিথি ও বক্তারা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে
ছবি: প্রথম আলো

চলতি বছর বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে গেলে দেশের অর্থনীতি আরও চাপে পড়বে। দেশের কোনো খাত এখন এই চাপ নিতে পারবে না। তাই নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর ব্যবসায়ীদের প্রধান কাজ হবে এলডিসি থেকে উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার কারণগুলো সরকারের সামনে তুলে ধরা। রাজধানীতে গতকাল মঙ্গলবার এক গোলটেবিল আলোচনায় এমন মতামত তুলে ধরেন ব্যবসায়ী নেতারা।

তবে ওই সভাতেই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, অর্থনীতির টেকসই উন্নয়ন চাইলে এলডিসি থেকে উত্তরণ হতে হবে। ছোট সুবিধার জন্য বড় সুবিধা হাতছাড়া করা যাবে না। এ ছাড়া ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে পাপেটের (পুতুল) মতো আচরণ না করে পেশাদার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ব্যাংকিং খাতে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে—এ নিয়ে গোলটেবিল বৈঠকটির আয়োজন করে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশ (আইসিসিবি)। গতকাল সকালে রাজধানীর বনানীর শেরাটন হোটেলে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ী নেতা ও ব্যাংকাররা বক্তব্য দেন। প্রধান অতিথি ছিলেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। আইসিসি বাংলাদেশের ব্যাংকিং কমিশনের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ এ (রুমী) আলী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন।

এলডিসি থেকে উত্তরণ একটি মৌলিক বিষয়। এটা আজ বা কাল ঘটবেই। বাংলাদেশকে সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান বা আফগানিস্তানের মতো দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করা উচিত নয়।
আহসান এইচ মনসুর, গভর্নর

এলডিসি পেছাতে যত যুক্তি

আলোচনায় অংশ নিয়ে নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক বলেন, ‘এলডিসি থেকে উত্তরণের পর যে চ্যালেঞ্জগুলো আসবে, সেগুলো মোকাবিলার জন্য আমরা এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নই। বেসরকারি খাত সাম্প্রতিক সময়ে অত্যন্ত কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অন্তত আগামী মে মাস পর্যন্ত রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।’

আইসিসি বাংলাদেশের সহসভাপতি ও হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ বলেন, ‘দেশে এখন ব্যাংকঋণের সুদহার বেড়ে গেছে। তাতে ১২ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। আগামী ৬ মাসে আরও ১২ লাখ চাকরি হারাবেন। দেশে বিনিয়োগ নেই, রাজস্ব আদায় কমে গেছে। এ অবস্থায় এলডিসি থেকে উত্তরণ পিছিয়ে দিতে বর্তমান সরকারকে এত বোঝানো হলো, কিন্তু তারা শুনল না। নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে আমাদের প্রধান কাজ হবে এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় পিছিয়ে দেওয়ার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা।’

আলোচনায় অংশ নিয়ে ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিমিন রহমান বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত খাতগুলোর ওপর প্রভাব ফেলবে। বর্তমানে বাংলাদেশ ক্যানসার, ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগসহ অনেক রোগের জীবন রক্ষাকারী ওষুধ সাশ্রয়ী মূল্যে উৎপাদন করেছে। এ অবস্থায় যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া এলডিসি থেকে উত্তরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ওষুধ খাতের ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বেড়ে যেতে পারে ওষুধের দাম। সামান্য দাম বাড়লেই এই খাতের রপ্তানি কমে যেতে পারে। এ জন্য এলডিসি থেকে উত্তরণ অবশ্যই সতর্কতার সঙ্গে করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও একটি স্পষ্ট জাতীয় পথরেখা। সমন্বিত নীতিসহায়তা পেলে ওষুধ খাত এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে।’

ব্যাংকঋণের সুদহার বেড়ে গেছে...দেশে বিনিয়োগ নেই, রাজস্ব আদায় কমে গেছে। এ অবস্থায় এলডিসি থেকে উত্তরণ পিছিয়ে দিতে বর্তমান সরকারকে এত বোঝানো হলো, কিন্তু তারা শুনল না।
এ কে আজাদ, এমডি, হা–মীম গ্রুপ

সভায় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকের (বিএবি) চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন, পিকার্ড বাংলাদেশের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক অমৃতা মাকিন ইসলামও তাঁদের বক্তব্যে এলডিসি উত্তরণের আগে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে নানা দাবির কথা তুলে ধরেন।

ব্যবসায়ীদের এসব দাবির পর প্রধান অতিথির বক্তব্যে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘এলডিসি থেকে উত্তরণ একটি মৌলিক বিষয়। এটা আজ বা কাল ঘটবেই। বাংলাদেশকে সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান বা আফগানিস্তানের মতো দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করা উচিত নয়। কারণ, জিডিপিসহ উন্নয়নের প্রতিটি সূচকে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে। বাংলাদেশ এখন আর সেই দেশগুলোর সমপর্যায়ে নেই এবং এই গ্রুপে থাকা আমাদের জন্য কোনো সম্মানের বিষয় নয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো মালয়েশিয়া বা ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের সারিতে গিয়ে বৈশ্বিক সম্মান অর্জন করা।’

গভর্নর বলেন, ‘ব্যাংক খাতে যখন ৬ থেকে ৯ সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছিল, তখন ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো তালি দিয়েছিল। অর্থ পাচারের সময়ও তারা চুপ ছিল। এমন আচরণ করলে গণতন্ত্র কখনো শক্তিশালী হয় না। সুদহার বাংলাদেশে বেশি, এটা আমিও স্বীকার করি। তবে এটা মানতে হবে, ২০ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়ে গেছে। তাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে ৬ শতাংশে নেমেছিল, তা বেড়ে এখন ১১ শতাংশে উঠেছে। যার প্রভাব পড়েছে সুদের হারে।’

গোলটেবিল আলোচনায় মূল প্রবন্ধে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবিব ব্যাংক খাতের বিভিন্ন পরিস্থিতি তুলে ধরেন। এ সময় তিনি বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বড় চ্যালেঞ্জ হবে নিজেদের প্রয়োজনীয়তা ধরে রাখা। এ জন্য শুধু প্রচলিত ঋণ কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমকে আরও বহুমুখী ও আধুনিক করতে হবে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্যাংক খাত ও রপ্তানি খাতের সার্বিক পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, প্রাইম ব্যাংকের এমডি হাসান ও. রশিদ এবং আইসিসি বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাসের এজাজ বিজয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা কত দিনে

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবসায়ী নেতা ফজলুল হক বলেন, ‘কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নির্বাচন হতে যাচ্ছে। আমরা আশা করি, নতুন সরকার কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। আমাদের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং খাত দরকার। গভর্নরের নেতৃত্বে ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনের কাজ চলছে। আশা করি আগামী নভেম্বরের আগে এটি সম্পন্ন হবে।’

ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত রাখতে হবে বলে উল্লেখ করে আহসান এইচ মনসুর বলেন, এ জন্য আধুনিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার মতো আইন সংস্কার প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্ডার সংশোধন চার মাস আগে সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। দুঃখজনক যে এটা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ রোধে এই অধ্যাদেশের অনুমোদন দরকার।