করপোরেট উত্তম চর্চার পথ দেখিয়েছে ইবিএল

সুশাসন, পেশাদারত্ব ও আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার কারণে এখন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকের একটি ইস্টার্ন ব্যাংক। ২০ বছর ধরে ইস্টার্ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪ শতাংশের ঘরে। আর্থিক নানা সূচকের পাশাপাশি ভাবমূর্তিতেও অনেক শক্তিশালী অবস্থানে এখন ব্যাংকটি। সেবার মানেও ব্যাংকটি অনন্য। ঋণ বিতরণসহ নানা সিদ্ধান্তে পরিবেশকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় ব্যাংকটি কয়েকবার বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই ব্যাংকের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই স্বীকৃতি ব্যাংকটিকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।

গত বছর প্রথমবারের মতো ৭৫০ কোটি টাকার রেকর্ড নিট মুনাফা করেছে বেসরকারি খাতের ইস্টার্ন ব্যাংক। ২০২৩ সালে ব্যাংকটি মুনাফা করেছিল ৬১১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটির মুনাফা ১৩৯ কোটি টাকা বেড়েছে। এ তথ্য জানিয়েছে ইস্টার্ন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

ব্যাংকটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ইস্টার্ন ব্যাংক গঠন হয় বহুজাতিক ব্যাংক অব ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ইন্টারন্যাশনাল (বিসিসিআই) পুনর্গঠনের মাধ্যমে। ১৯৯২ সালে বন্ধ হয়ে যায় বিসিসিআই, তৎকালীন সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তে বিসিসিআইয়ের বড় অঙ্কের আমানতকারীরা হয়ে যান ইস্টার্ন ব্যাংকের মালিকানার অংশীদার। সরকারও ৬০ শতাংশ শেয়ার নিয়ে ব্যাংকটির পর্ষদে যুক্ত হয়। পরে ওই শেয়ার বিক্রি করে দেয় সরকার। আমানতকারী থেকে মালিকানার অংশীদার হওয়া পরিচালকেরা পরবর্তী সময়ে ইস্টার্ন ব্যাংককে দেশের আন্তর্জাতিক মানের ব্যাংকে রূপান্তরের উদ্যোগ নেন। যে উদ্যোগ অনেকটাই সফল হয়েছে।

ইস্টার্ন ব্যাংককে দেশের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যাংকে উন্নীত করতে নেতৃত্ব দিয়েছেন বহুজাতিক ব্যাংকের অভিজ্ঞ ব্যাংকাররা। ব্যাংকটির কয়েকজন পরিচালকও এতে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছেন। ২০০৭ সাল থেকে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন আলী রেজা ইফতেখার। ১৯৯২ সালে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, বিভিন্ন ব্যাংকের এমডিদের নিয়ে পুনর্গঠিত ব্যাংকটির পর্ষদ গঠন করা হয়। নাম দেওয়া হয় ইস্টার্ন ব্যাংক। ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে তখন থেকে এখনো রয়েছেন ফিনলে, এমজিএইচ, ইউনিক ও মীর গ্রুপের প্রতিনিধি।

২০০২ সালে কোর ব্যাংকিং সলিউশন (সিবিএস) বাস্তবায়ন করে ইস্টার্ন ব্যাংক, যা দেশে প্রথম। এতে নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার হয়, অনিয়ম-জালিয়াতি কমে আসে। জনবল নিয়োগ, ব্যাংক পরিচালনা থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে বিদেশি ব্যাংককে অনুসরণ শুরু করে ইস্টার্ন ব্যাংক। পরে খুচরা ঋণ, কার্ড সেবা চালু করে ব্যাংকটি।

ব্যাংকটির নথিপত্র অনুযায়ী, ২০০০ সালে ইস্টার্ন ব্যাংকের আমানত ছিল ১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। আর ঋণ ছিল ৮১৪ কোটি টাকা। ওই বছর নিট মুনাফা হয় ২৫ কোটি টাকা। ২০০৫ সালে আমানত বেড়ে হয় ১ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। ঋণও বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকায়। ওই বছরে নিট মুনাফা হয় ৫৫ কোটি টাকা। 

২০২৪ সাল শেষে ইস্টার্ন ব্যাংকের আমানত ও ঋণের পরিমাণ প্রথমবারের মতো ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। গত বছর শেষে ব্যাংকটির আমানত বেড়ে দাঁড়ায় ৪৫ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা। আর ঋণের পরিমাণ বেড়ে ৪১ হাজার ৭২ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। গত বছরে নিট মুনাফা হয় ৭৫০ কোটি টাকা, ২০২৩ সালে মুনাফা ছিল ৬১০ কোটি টাকা।

ব্যাংকটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মেয়াদি ঋণের ৩৫ শতাংশই টেকসই খাতে বিতরণ করেছে ব্যাংকটি। গত বছর ব্যাংকটি ১২টি উপশাখা, ১৬টি এজেন্ট আউটলেট, ৫০টি এটিএম ও ৩টি অগ্রাধিকার সেবা চালু করে। এসব উদ্যোগ ব্যাংকটির নারী উদ্যোক্তা, এসএমই ও প্রান্তিক সেবা সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছে। গত বছরের শেষে সারা দেশে ব্যাংকটির শাখা ছিল ৮৫টি। উপশাখা বেড়ে হয়েছে ৪৫টি আর এজেন্ট আউটলেটের সংখ্যা ১১৮।

ব্যাংকিং নানা সূচকে ভালো অবস্থানে পৌঁছালেও দেশের সব জেলায় শাখা নেই ব্যাংকটির। এরপরও ব্যাংকটিতে গত বছর এক লাখের বেশি নতুন গ্রাহক যুক্ত হয়েছেন। চলতি বছর প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার নতুন গ্রাহক যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ব্যাংকটি। খরচের তুলনায় আয় অনুপাত বা কস্ট টু ইনকাম রেশিও ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ টাকা আয় করতে ৪০ টাকা খরচ হয়। গত বছরে ব্যাংকের গ্রাহকসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ লাখ ৫৫ হাজার ৭০৩ জনে। গত বছর শেষে স্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক মিলিয়ে ব্যাংকটির কর্মীর সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৪২৮। এর মধ্যে ৭৬১ জন নারী কর্মকর্তা।

ব্যাংকটি জানিয়েছে, এমন নানা উদ্যোগ তাদের টেকসই ও স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির পথ সুগম করেছে, যা ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যাংকটির প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করেছে।