কমিউনিটি ব্যাংকে আসছেন ৪৫ বছর বয়সী এমডি, ৪০–এর ঘরে আগেও যাঁরা ছিলেন
ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা ও সুশাসন নিশ্চিত করে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে উদ্ভাবনী সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত এই শীর্ষ পদের জন্য দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং বয়সের পরিপক্বতাকে মানদণ্ড ধরা হয়।
যদিও বিশ্বজুড়ে ৩০ বছরের কম বয়সের তরুণদের এই পদে দেখা যায়। গত বছর ২৯ বছর বয়সে গোল্ডম্যান স্যাকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হয়েছেন পাওলো কস্তা। এর আগে তিনি বিনিয়োগ কর্মকর্তা ও অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন। বাংলাদেশেও একই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মে কোনো ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হতে কমপক্ষে ৪৫ বছর বয়স ও ২০ বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। এর মধ্যে তিন বছর ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ও অতিরিক্ত এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। এই শর্ত পূরণ করে কমিউনিটি ব্যাংকের এমডি হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন কিমিয়া সাদাত।
বাংলাদেশ পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের মালিকানাধীন কমিউনিটি ব্যাংকের এমডি হিসেবে আগামী ১৪ মে তিনি দায়িত্ব নেবেন। তখন তাঁর বয়স হবে ৪৫ বছরের কিছু বেশি। তার আগের দিন ডিএমডি ও অতিরিক্ত এমডি পদে তিন বছর দায়িত্ব পালন সম্পন্ন হবে। এর মাধ্যমে তিনি দেশের ব্যাংকিং খাতে কনিষ্ঠ এমডি পদে দায়িত্ব পালন শুরু করবেন। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে তিনি অতিরিক্ত এমডির পাশাপাশি এমডি পদের চলতি দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। কমিউনিটি ব্যাংক নিয়ে নিজের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রথম আলোকে।
অভিজ্ঞতা ও ক্যারিয়ার
কমিউনিটি ব্যাংকে যোগদানের আগে কিমিয়া সাদাত মেঘনা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ছিলেন। দেশীয় ও বহুজাতিক ব্যাংকিং খাতে তাঁর রয়েছে ২৩ বছরের অভিজ্ঞতা। বর্ণাঢ্য এ ক্যারিয়ারে তিনি এইচএসবিসি বাংলাদেশ, দ্য সিটি ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংকের মতো প্রথম সারির প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন।
কিমিয়া সাদাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিন্যান্স বিষয়ে বিবিএ ও এমবিএ সম্পন্ন করে ব্যাংকিং পেশা শুরু করেন। তিনি সার্টিফায়েড ফিন্যান্সিয়াল কনসালট্যান্ট (সিএফসি) সনদপ্রাপ্ত।
২০২৫ সালের এপ্রিলে কমিউনিটি ব্যাংকের নেতৃত্বে আসার পর থেকেই ব্যাংকটি গত কয়েক মাসে ভালো করছে। কিমিয়া সাদাতের মেয়াদে (এপ্রিল ২০২৫–ডিসেম্বর ২০২৫) ব্যাংকটির নিট মুনাফা ৪৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালে নিট মুনাফা ছিল ৭০ কোটি টাকা। একই সময়ে আমানত ৩২ শতাংশ বা ১ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৩৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া গত বছর ঋণ ৩৬৪ কোটি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৬১১ কোটি টাকা। ব্যাংকটি খেলাপি ঋণে ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখিয়েছে। ২০২৪ সালে খেলাপি ঋণ ছিল ৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ, তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৬০ শতাংশ। এর মাধ্যমে তিনি দক্ষ নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন। ব্যাংকটির শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ, যার পরিমাণ সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা।
গত বছর কিমিয়া সাদাতের অধীনই বাংলাদেশে প্রথম ব্যাংক হিসেবে বাংলাকিউআরের মাধ্যমে ট্রাফিক জরিমানা আদায়ের ক্যাশলেস পদ্ধতি চালু হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকটি ডিজিটাল লেনদেনে সাফল্য দেখিয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকটির লেনদেনের প্রায় ৬৪ শতাংশ সম্পন্ন হচ্ছে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। নতুন হিসাবের ৩০ শতাংশ হচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যমে। এ ছাড়া ব্যাংকটি এসএমই ৩০, স্টার্টআপ নেস্ট ও প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাস সঞ্চয়’ প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে। ব্যাংকটি অফশোর ব্যাংকিং ও ইসলামী ব্যাংকিং উইংয়ের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন পেয়েছে। সাধারণ গ্রাহকদের তাৎক্ষণিক আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে ডিজিটাল ন্যানো-লোন বা ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা চালু করা করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কী
কিমিয়া সাদাত কমিউনিটি ব্যাংককে বাংলাদেশের অন্যতম স্থিতিশীল, প্রযুক্তিচালিত ও সুশাসিত ব্যাংক হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন। প্রথম আলোকে তিনি জানান, তাঁর কর্মপরিকল্পনা চারটি প্রধান স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এগুলো হলো সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, টেকসই ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি, পরিচালনা দক্ষতা বৃদ্ধি ও আর্থিক স্থিতিপত্র ও তারল্য ব্যবস্থাপনা করা। বর্তমানে ব্যাংকটির ১৯টি শাখা ও ৫টি উপশাখা আছে। এ ছাড়া ব্যাংকটির ১৮৭টি এটিএম বুথ রয়েছে। এর মধ্যে ১১১টি বুথে গ্রাহকসহায়তা কেন্দ্র রয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং সেবা দিয়ে যাচ্ছে কমিউনিটি ব্যাংক। ফলে ব্যাংকটি পুরো দেশে পৌঁছে গেছে।
ব্যাংকটি আগামী তিন বছরে ১০টি নতুন শাখা, ১৫টি উপশাখা ও ৫০টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট খোলার পরিকল্পনা করছে। ২০২৭ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার স্থাপন এবং ২০২৬ সালের মধ্যে একটি ডিজাস্টার রিকভারি (ডিআর) সাইট তৈরির পরিকল্পনা আছে। এ ছাড়া ২০২৮ সালের মধ্যে আমানত ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ও ঋণ ৮ হাজার ৮০০ কোটি টাকায় উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ সময়ে ইসলামী ব্যাংকিং সেবা, অফশোর ব্যাংকিং ও ব্যাংকাসুরেন্স সেবা পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর প্রক্রিয়া চলছে।
কিমিয়া সাদাতের মূল লক্ষ্য হলো, আগামী তিন বছরের মধ্যে কমিউনিটি ব্যাংককে নতুন প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্যতম লাভজনক অবস্থানে নিয়ে যাওয়া এবং খেলাপি ঋণের হার সর্বনিম্ন রাখা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা কমিউনিটি ব্যাংকের মাধ্যমে ভোক্তা ঋণকে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। সারা দেশে আমাদের এটিএম বুথ ও সেবাকেন্দ্র আছে। এর মাধ্যমে আমরা ভোক্তা ঋণ বৃদ্ধি করব। পুলিশের দুই লাখ সদস্য আছেন। তাঁরা আমাদের প্রধান গ্রাহক। পাশাপাশি সাধারণ জনগণও আমাদের অগ্রাধিকারে থাকবে। এসব ঋণ আদায় হবে বেতন থেকে। তাই এসব ঋণ নিরাপদ।’
আগেও যাঁরা কনিষ্ঠতম ছিলেন
২০২৩ আগে ব্যাংক এমডি হতে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা ও বয়স কমপক্ষে ৪০ বছর হওয়া প্রয়োজন ছিল। তখনো অনেকে কম বয়সে এমডি হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই সফলতম এমডি হিসেবে পরিচিত। তাঁদের কেউ অবসরে গেছেন, কেউ এখনো পদে আছেন।
২০০১ সালে কে মাহমুদ সাত্তার যখন ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডি হন, তখন তাঁর বয়স ছিল ৪১ বছর ৮ মাস। পরে সিটি ব্যাংকের এমডি পদ থেকে তিনি অবসরে যান। ২০০৬ সালে ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি হয়েছিলেন প্রয়াত ইমরান রহমান, তখন তাঁর বয়স ছিল ৪৪ বছর। ২০০৭ সালে আলী রেজা ইফতেখার ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডির দায়িত্ব নেন ৪৬ বছর বয়সে, সম্প্রতি তিনি অবসরে গেছেন। ২০১০ সালে ৪৮ বছর বয়সে ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি হয়েছিলেন সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। বর্তমানে তিনি মিউচুয়াল ট্রাষ্ট ব্যাংকের এমডি। ২০১৩ সালে ৪৫ বছর বয়সে সিটি ব্যাংকের এমডি হয়েছিলেন সোহেল আর কে হোসেইন। বর্তমানে তিনি ব্যাংক এশিয়ার এমডি।
২০১৬ সালে আরফান আলী ব্যাংক এশিয়ার এমডি হয়েছিলেন ৪৭ বছর বয়সে, বর্তমানে তিনি জয়তুন বিজনেস সলিউশনের চেয়ারম্যান। ২০১৭ সালে ৪৫ বছর বয়সে প্রাইম ব্যাংকের এমডি হয়েছিলেন রাহেল আহমেদ, বর্তমানে তিনি বি গ্লোবাল ট্রেড ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা অংশীদার। ২০১৯ সালে সিটি ব্যাংকের এমডির দায়িত্ব নেন মাসরুর আরেফিন; তখন তাঁর বয়স ছিল ৪৮ বছর। সংশ্লিষ্ট এমডি ও ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলে বয়সের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।