স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের খুচরা ব্যবসা কিনতে আগ্রহী দেশের ৬ ব্যাংক

  • যেসব ব্যাংক আগ্রহী—ব্র্যাক, সিটি, পূবালী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, ঢাকা ও ডাচ্–বাংলা ব্যাংক।

  • স্ট্যানচার্টের রিটেইল ব্যবসার আওতায় আমানত রয়েছে ১৬ হাজার কোটি টাকা।

  • ঋণের পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশের ভোক্তা ব্যাংকিং (রিটেইল) ব্যবসা বিক্রি করে দেবে বহুজাতিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। সংক্ষেপে ব্যাংকটি এসসিবি ও স্ট্যানচার্ট হিসেবে পরিচিত। ব্যাংকটি তাদের ব্যক্তিগত পর্যায়ের ঋণ ও শাখা কার্যক্রম, ইসলামি ব্যাংকিং ও ক্রেডিট কার্ড সেবাসহ রিটেইল ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে জড়িত ব্যবসা বিক্রি করে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।

বাংলাদেশে ১২০ বছর ধরে কার্যক্রম চালানো এই ব্যাংকের রিটেইল ব্যবসা কিনতে শুরুতে আগ্রহ দেখিয়েছিল দেশের বেসরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক। এখন নতুন করে স্ট্যানচার্টের ব্যবসা কিনতে আগ্রহী পূবালী ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক ও ডাচ্–বাংলা ব্যাংক। এর মধ্যে আগ্রহী কয়েকটি ব্যাংক ব্যবসাসংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ের জন্য অপ্রকাশযোগ্য চুক্তিও (এনডিএ) স্বাক্ষর করেছে। বাকি ব্যাংকগুলোও এনডিএ স্বাক্ষরের জন্য আগ্রহ দেখিয়ে চিঠি দিয়েছে।

আগ্রহী ক্রেতা ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বহুজাতিক স্ট্যানচার্টের রিটেইল ব্যবসার আওতায় যে আমানত জমা রয়েছে, তা খুবই কম সুদের আমানত। এসব আমানতের বড় অংশের বিপরীতে ব্যাংকটিকে সুদ দিতে হয় ১ থেকে ২ শতাংশ। যেখানে দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর আমানতের বড় অংশের সুদের হার ৬ থেকে ৯ শতাংশ। এ কারণে দেশের ভালো মানের ব্যাংকগুলো স্ট্যানচার্টের কম সুদের আমানত পেতে আগ্রহ বেশি দেখাচ্ছে।

তবে স্ট্যানচার্ট তাদের রিটেইল ব্যবসার সম্পদ ও দায়ের পাশাপাশি দেড় হাজার জনবলকেও অধিগ্রহণের শর্ত দিয়েছে। এ কারণে আগ্রহী ব্যাংকগুলোর মধ্যে কয়েকটি এ নিয়ে নতুন করে লাভ–লোকসানের হিসাব কষছে। আবার রিটেইল ব্যবসা কিনে নিলেও ক্রেতা ব্যাংকগুলো কোনোভাবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের নাম ব্যবহার করতে পারবে না। তখন কম সুদের এই আমানত থাকবে কি না, এ নিয়েও দোটানায় পড়েছে আগ্রহী ব্যাংকগুলো।

স্ট্যানচার্টের বাংলাদেশের রিটেইল ব্যবসা বিক্রির বিষয়টি তদারক করছেন ব্যাংকটির দুবাই কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত একজন শীর্ষ কর্মকর্তা। তিনি একীভূত ও অধিগ্রহণ বিষয়ে অভিজ্ঞ। এর আগে তিনি ব্যাংকটির এশিয়ার কয়েকটি দেশের প্রধান নির্বাহী ছিলেন। মূলত তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন আগ্রহী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে সেবাটি বিক্রির আগে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক নিলাম ডাকা হবে। সেই নিলামে অংশ নেওয়ার পরই নির্ধারণ হবে কারা পাচ্ছে স্ট্যানচার্টের রিটেইল ব্যবসা।

আগ্রহী ব্যাংকগুলোর মধ্য থেকে এ বিষয়ে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা স্ট্যানচার্টের সঙ্গে তাদের রিটেইল ব্যবসা অধিগ্রহণের বিষয়ে আলোচনা করেছি। তবে তারা ব্যবসা বিক্রির সঙ্গে কর্মীদের বিষয়েও নিশ্চয়তা চেয়েছে। এ অবস্থায় এই অধিগ্রহণ আমাদের জন্য কতটা লাভজনক হবে, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কারণ, এত জনবল তো নেওয়া সম্ভব নয়।’

স্ট্যানচার্ট সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে তাদের রিটেইল ব্যাংকিং সবচেয়ে বিস্তৃত। ব্যাংকটির মোট ১ হাজার ৯০০ কর্মীর মধ্যে দেড় হাজার কর্মীই এ খাতে কর্মরত। ব্যাংকটির ১৮টি শাখা, একটি ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো ও ইসলামি ব্যাংকিং সেবা রিটেইল ব্যবসার আওতায় রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড সেবা। ব্যাংকটির রিটেইল ব্যাংকিং সেবার মধ্যে আরও রয়েছে স্মার্ট ও চলতি হিসাব, স্থায়ী ও বৈদেশিক মুদ্রা আমানত, প্রিমিয়াম ও রিওয়ার্ডভিত্তিক ক্রেডিট কার্ড, জামানতবিহীন ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ। ব্যক্তিগত প্রয়োজনে নেওয়া পারসোনাল লোন, গাড়ির ঋণ এবং ফ্ল্যাট কেনা বা বাড়ি সংস্কারের জন্য দেওয়া গৃহঋণ। সব মিলিয়ে ব্যাংকটির রিটেইল ব্যবসার আওতায় আমানত রয়েছে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে ঋণ রয়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশের রিটেইল ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার আগ্রহ দেখায় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। এরপরই দেশের কয়েকটি ব্যাংক রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসার অংশ অধিগ্রহণে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে। এর আগে গত বছরের মাঝামাঝি বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধের ঘোষণা দেয় বহুজাতিক আরেক ব্যাংক দ্য হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন (এইচএসবিসি)। তারও আগে ২০০৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেয় বহুজাতিক আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্যাংক।

বাংলাদেশ ছাড়াও কৌশলগত পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড অ্যাঙ্গোলা, ক্যামেরুন, গাম্বিয়া, জর্ডান, লেবানন, সিয়েরা লিওন ও জিম্বাবুয়ে থেকে স্থানীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তানজানিয়া ও আইভরি কোস্টে কনজ্যুমার, প্রাইভেট ও বিজনেস ব্যাংকিং থেকে সরে গেলেও করপোরেট ও ইনস্টিটিউশনাল ব্যাংকিং চালু রাখে। পরে শ্রীলঙ্কায় সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রি করে দেয়। বাংলাদেশে ব্যবসা বিক্রির বিষয়টি ব্যাংকটির বৈশ্বিক ব্যবসায়িক কৌশলের অংশ।

জানতে চাইলে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স, ব্র্যান্ড অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের প্রধান বিটপী দাশ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড গ্রুপ ধারাবাহিকভাবে বৈশ্বিক ব্যবসায়িক মডেলের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে। তার ভিত্তিতে যেখানে গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে অনন্য সুবিধা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে, সেখানে সম্পদ কেন্দ্রীয়করণ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করে।’