বিএবি সুদহারের সীমা তুলে দেওয়াসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা পর্যালোচনা করে দেখছে।

সিরাজুল ইসলাম, নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র, বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ঋণের সুদ সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে দেয়। তাতে আমানতের সুদহারও কমে যায়। একপর্যায়ে আমানতের সুদহার ৫ শতাংশের নিচে নেমে এলে বাংলাদেশ ব্যাংক মেয়াদি আমানতের ক্ষেত্রে সুদহার গড় মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হবে না বলে জানিয়ে দেয়। ফলে ব্যাংক আমানতের সুদহার কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু ঋণের সুদ বাড়াতে পারছে না ব্যাংকগুলো। এতে কয়েকটি ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনায় অসামঞ্জস্য দেখা দিয়েছে। তাই ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের পর এবার ব্যাংকমালিকেরাও ঋণের সুদের সীমা তুলে দেওয়ার দাবি জানালেন।

বিএবির চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে সব ধরনের ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের জন্য এটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু পরে ব্যাংকগুলো এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। ঋণের সুদহারের সীমা বেঁধে দেওয়ার কারণে ব্যাংকগুলো আয় ঠিক রাখতে আমানতের সুদও কমিয়ে দেয়। এখন কম সুদে আমানত সংগ্রহ করা খুব চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে সাম্প্রতিক মুদ্রাস্ফীতির প্রভাবে আমানত সংগ্রহ আরও কঠোরতর হয়ে পড়েছে। মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে আমানতের সুদহার বৃদ্ধি না করলে ব্যাংকগুলো নতুন আমানত তো পাবেই না, বরং বিদ্যমান আমানতও হারাবে। তাই ক্ষেত্রবিশেষে ঋণের সুদেরহার বৃদ্ধি করা প্রয়োজন, যাতে ব্যাংকগুলোর ঋণ থেকে অর্জিত আয় বৃদ্ধি পায় এবং আমানতের জন্য অধিক সুদ প্রদান করতে পারে।

ঋণের সুদহার বাড়ানোর কৌশলও বাতলে দিয়েছে বিএবি। বিএবি বলছে, গাড়ি, ফ্রিজ, ইলেকট্রনিকস, কসমেটিকসের (কম্পিউটার ছাড়া) মতো বিলাসপণ্য বা এসব পণ্যের যন্ত্রাংশ বা কাঁচামাল আমদানি, উৎপাদন ও কেনার জন্য ব্যাংকঋণের সুদ ৯ শতাংশের বেশি করা যেতে পারে। বিভিন্ন অনুৎপাদনশীল (ট্রেডিং) এবং আমদানিনির্ভর (ভ্যালু এডিশন শিল্প ব্যতিরেকে) শিল্পের জন্য প্রদত্ত ঋণের সুদহার বাড়ানো যেতে পারে।

এ ছাড়া অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি (সিএমএসএমই) ও ভোক্তাঋণে সুদহার বাড়াতে বলেছে বিএবি। বিএবি বলেছে, মেয়াদি আমানতের সুদ কোনোভাবেই মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম হতে পারবে না—এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই নির্দেশনা অনুযায়ী আমানত সংগ্রহ করলে সিএমএসএমই ও ভোক্তাঋণে সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব। এ ধরনের ঋণ কর্মসূচি ব্যাংকের আয়-ব্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা কঠিন। সিএমএসএমই ও ভোক্তাঋণের পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি, কারণ একজন গ্রাহককে এই ঋণ দেওয়ার আগে এবং পরে অনেক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়, যা করপোরেট গ্রুপের ঋণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

বিএবি চিঠিতে আরও বলেছে, সিএমএসএমই ও ভোক্তাঋণের গ্রাহকপ্রতি গড় ঋণ মাত্র ৫ লাখ টাকা। তাতে ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ দিতে প্রায় ১ লাখ গ্রাহকের কাছে যেতে হয়। অথচ ৫০টি করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে ১০০ কোটি টাকা করে ঋণ দিলে ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণ হয়।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, যদি ব্যাংকগুলো ছোটদের ঋণে আগ্রহ হারায়, তাহলে এসব গ্রাহককে বিভিন্ন এনজিও বা কো-অপারেটিভ সোসাইটি থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হবে। যেখানে সুদের হার ২২-২৪ শতাংশ। আবার উদ্যোক্তাদের অনেকেই প্রয়োজনীয় ঋণের জন্য স্থানীয় মহাজন থেকে দৈনিক উচ্চহারে সুদভিত্তিক ঋণ নেবেন, যা কোনোভাবেই মঙ্গলজনক নয়। পাশাপাশি বিএবি জানিয়েছে, ব্যাংকের সুদহার যতই বৃদ্ধি করা হোক না কেন, সঞ্চয়পত্রের সুদহার সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে ব্যাংকের পক্ষে আমানত সংগ্রহ করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে থাকবে।

এ জন্য কৃষি ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প, রপ্তানিমুখী পণ্য উৎপাদন, রপ্তানির উদ্দেশ্যে কাঁচামাল আমদানি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী শিল্পের জন্য বরাদ্দকৃত ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ রেখে অনুৎপাদনশীল খাতসহ ভোক্তাঋণের সুদ বাড়ালে ঋণ বিতরণ সীমার মধ্যে থাকবে। ফলে বাজারে অর্থের প্রবাহ ঠিক থাকবে, যা মূল্যস্ফীতি রোধে সহায়ক হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিএবি সুদহারের সীমা তুলে দেওয়াসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা পর্যালোচনা করে দেখছে।

ব্যাংক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন