কারা এবং কেন এত শেয়ার কিনেছে, তা আমরা জানি না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারে আমাদের ব্যাংকের শেয়ারের লেনদেন ও দাম উভয়ই বেড়েছে।
মেহমুদ হোসেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ন্যাশনাল ব্যাংক

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি সূত্রে জানা যায়, গত জুনে সাত ব্যক্তির নামে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শেয়ার কেনা হয়। এর মধ্যে ছয়জনের নামে ব্যাংকটির মোট শেয়ারের ২ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ার কেনা হয়েছে। আর অপরজনের নামে কেনা হয়েছে ৫ শতাংশের বেশি শেয়ার। সব মিলিয়ে সাতজনের নামে ব্যাংকটির ৫৮ কোটি ৯৬ লাখ ৮২ হাজার শেয়ার কেনা হয়েছে। প্রতিটি শেয়ারের দাম ৮ টাকা ধরে হিসাব করলে এসব শেয়ার কিনতে খরচ হয়েছে প্রায় ৪৭২ কোটি টাকা।

শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির করা আইন অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি বা ব্যাংকের পরিচালক হতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নামে ওই কোম্পানির ন্যূনতম ২ শতাংশ শেয়ার থাকতে হয়। শেয়ারবাজার থেকে ন্যূনতম ২ শতাংশ শেয়ার কিনে কোম্পানির পরিচালক হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে শেয়ার কিনে পরিচালক হতে হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির পর্ষদের অনুমোদন লাগে। এর আগে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে শেয়ারবাজার থেকে শেয়ার কেনার পর ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের মালিকানায় বদল এসেছিল।

হঠাৎ করে বাজার থেকে কয়েকজন ব্যক্তির বিপুল পরিমাণ শেয়ার কেনার বিষয়ে জানতে চাইলে ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেহমুদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘কারা এবং কেন এত শেয়ার কিনেছে, তা আমরা জানি না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারে আমাদের ব্যাংকের শেয়ারের লেনদেন ও দাম উভয়ই বেড়েছে।’

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন প্রায় ৩ হাজার ২১৯ কোটি টাকা, যা ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রায় ৩২১ কোটি ৯৭ লাখ শেয়ারে বিভক্ত। কোম্পানিটির প্রায় ৩২২ কোটি শেয়ারের মধ্যে গত জুন মাসে মো. নুরুল ইসলামের নামে কেনা হয়েছে ১৬ কোটি ২৮ লাখ শেয়ার, যা ব্যাংকটির মোট শেয়ারের ৫ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। সরদার মো. তারেক হাসানের নামে কেনা হয়েছে ৯ কোটি ১৮ লাখ শেয়ার, যা ব্যাংকটির মোট শেয়ারের ২ দশমিক ৮৫ শতাংশ। মো. সোহরাব হোসেনের নামে কেনা হয়েছে প্রায় ৭ কোটি ২৭ লাখ শেয়ার, যা ব্যাংকটির মোট শেয়ারের ২ দশমিক ২৬ শতাংশ। সরোজ কুমার বণিকের নামে কেনা হয়েছে প্রায় ৬ কোটি ৯১ লাখ শেয়ার, যা ব্যাংকটির শেয়ারের ২ দশমিক ১৫ শতাংশ। এ ছাড়া আবুল মিল্লাত, সিরাজুল ইসলাম ও নুরজাহান বেগমের নামে প্রায় ৬ কোটি ৪৪ লাখ করে শেয়ার কেনা হয়েছে। এ তিনজনের প্রত্যেকের নামে ২ শতাংশ করে শেয়ার কেনা হয়েছে। তবে উল্লেখিত সাত ব্যক্তির বিস্তারিত পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।

ন্যাশনাল ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যাঁদের নামে শেয়ার কেনা হয়েছে, তাঁরা মূল শেয়ারের মালিক নন। তাঁদের নাম ব্যবহার করে একটি পক্ষ ব্যাংকটির শেয়ার কিনেছে। ব্যাংকটির এখনকার মালিক সিকদার পরিবারের ইচ্ছাতেই এসব শেয়ার কেনা হয়েছে। এর মাধ্যমে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী ব্যাংকটিতে কয়েকজন পরিচালক নিয়োগ দিয়ে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করতে চায় সিকদার পরিবার।

বর্তমানে ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সিকদার পরিবারের বাইরের পরিচালক হিসেবে রয়েছেন চট্রগ্রামের কেডিএস গ্রুপের মালিক খলিলুর রহমান, হোসাফ গ্রুপের মোয়াজ্জেম হোসেন ও মাবরুর হোসেন এবং বিএনপিদলীয় সাবেক সংসদ সদস্য জাকারিয়া তাহের। ব্যাংকটির পরিচালনা নিয়ে এ চার পরিচালকের সঙ্গে ব্যাংকের পর্ষদে থাকা সিকদার পরিবারের ছেলেদের বিরোধ রয়েছে।

এদিকে, নানা অনিয়মের কারণে ব্যাংকটির ঋণ কার্যক্রম বন্ধ করে রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ অবস্থায় ব্যাংকটির এক পক্ষ চাইছে প্রভাবশালী একটি পক্ষকে মালিকানায় যুক্ত করে ঋণ কার্যক্রম চালু করতে। চট্টগ্রামভিত্তিক একটি গোষ্ঠী এ মালিকানার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বলে নানা সূত্রে জানা গেছে।

ন্যাশনাল ব্যাংক একসময় ভালো ব্যাংক হিসেবে পরিচিত ছিল। ২০০৯ সালে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এটির পরিচালনা পর্ষদেরও বদল হয়। ব্যাংকটির কর্তৃত্ব চলে যায় সিকদার গ্রুপের চেয়ারম্যান জয়নুল হক সিকদারের কাছে। এরপর থেকেই প্রথম প্রজন্মের এ ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপ হতে শুরু করে। ব্যাংকটির চেয়ারম্যান জয়নুল হক সিকদার গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি মারা যান। গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি নতুন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন তাঁর স্ত্রী মনোয়ারা সিকদার। এ ছাড়া জয়নুল হক সিকদারের সন্তানদের মধ্যে ব্যাংকটির পর্ষদে রয়েছে তাঁর মেয়ে পারভীন হক সিকদার, ছেলে রিক হক সিকদার ও রন হক সিকদার।

ব্যাংকটির ১২ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদে মালিকদের মধ্য থেকে পরিচালক পদে রয়েছেন মোট আটজন। এর মধ্যে চারজন সিকদার পরিবারের। বাকি চারজন ওই পরিবারের বাইরে। এর বাইরে সিকদার গ্রুপের প্রতিষ্ঠান থেকে মনোনীত একজন পরিচালক রয়েছেন। বাকি দুজন স্বতন্ত্র পরিচালক। আর পদাধিকারবলে পর্ষদে রয়েছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকও।

ব্যাংক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন