বড় মুনাফা সোনালীর, বিপুল লোকসান জনতার

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে একসময় অন্যতম প্রধান মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তাদের অর্থায়নে দেশে বড় বড় শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। তবে সময়ের ব্যবধানে সেই পরিস্থিতি এখন আর নেই।

দেশের শিল্প খাতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নতুন ঋণ এখন নেই বললেই চলে; বরং রাষ্ট্রায়ত্ত বেশির ভাগ ব্যাংক গত কয়েক দশকে অনিয়ম–দুর্নীতির কারণে ব্যাংক খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মধ্যে জনতা ব্যাংক গত বছরের শেষে রেকর্ড লোকসান করেছে। গত বছরের শেষে ব্যাংকটি প্রায় চার হাজার কোটি টাকা লোকসান করেছে; আর হলমার্ক কেলেঙ্কারির পর শিল্প অর্থায়ন প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে সোনালী ব্যাংক। অলস টাকা ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করে গত বছরের শেষে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে সোনালী ব্যাংক; আর রূপালী ও অগ্রণী ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিশেষ সুবিধা নিয়ে গত বছরের শেষে মুনাফা দেখিয়েছে। ব্যাংক চারটির গত বছরের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এই চিত্র পাওয়া গেছে।

বড় মুনাফায় সোনালী ব্যাংক

রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে সোনালী ব্যাংক। ২০২৪ সালে সোনালী ব্যাংক ৯৮৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল। গত বছরের শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা। দেশের সরকারি–বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে গত বছরের শেষে মুনাফার দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে সোনালী ব্যাংক। এই তালিকায় প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে বেসরকারি খাতের ব্র্যাক ও সিটি ব্যাংক। ব্র্যাক ব্যাংক গত বছর ২ হাজার ২৫১ কোটি টাকা ও সিটি ব্যাংক ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা মুনাফা করেছে।

আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংকের মুনাফার বড় অংশ এসেছে সরকারি বিল–বন্ডে বিনিয়োগ থেকে। ব্যাংকটির কোনো নিরাপত্তাসঞ্চিতি ও মূলধনঘাটতি নেই। ব্যাংকটি অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের তুলনায়ও খেলাপি ঋণের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় এগিয়ে ছিল।

জানতে চাইলে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শওকত আলী খান প্রথম আলোকে বলেন, আমরা বড় ঋণের পরিবর্তে এসএমই ও ভোক্তা খাতে ঋণ বিতরণে বেশি জোর দিয়েছি। এর বাইরে বড় অঙ্কের অর্থ সরকারি বিল–বন্ডে বিনিয়োগ করেছি। এতে ভালো মুনাফা এসেছে। আমাদের ব্যাংকের ভিত্তিও দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। সামনে আরও ভালো মুনাফা করা সম্ভব হবে।

খেলাপিতে বিপর্যস্ত জনতা

জনতা ব্যাংক বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। ব্যাংকটির লোকসানের পাল্লা বছর–বছর ভারী হচ্ছে, যার প্রধান কারণ মুষ্টিমেয় কিছু বড় গ্রাহকের ঋণখেলাপি হয়ে পড়া। ব্যাংকটির ৭০ শতাংশ ঋণই এখন খেলাপি। এতে গত বছরের শেষে ব্যাংকটির লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৩১ কোটি টাকায়। ২০২৪ সালে যার পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৬৬ কোটি টাকা।

ব্যাংকটির বড় খেলাপি গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে বেক্সিমকো, এস আলম, এননটেক্স, ক্রিসেন্ট, জনকণ্ঠসহ বড় কিছু শিল্প গ্রুপ। এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপি হয়ে যাওয়ায় ব্যাংকটি পরিচালন লোকসান করছে। গ্রাহকদের ঋণ থেকে যে সুদ আয় হচ্ছে, তার থেকে অনেক বেশি সুদ ব্যয় হচ্ছে আমানতকারীদের পেছনে। এতেই বড় অঙ্কের লোকসানে পড়েছে ব্যাংকটি।

জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের এমডি মজিবর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের বড় ঋণগ্রহীতাদের প্রায় সবাই খেলাপি। এসব ঋণ আদায়ে তদারকি জোরদার করা হয়েছে, তবে সাফল্য খুব কম। কারণ, অনেকেই জেলে বা দেশের বাইরে রয়েছেন। এ অবস্থায় আমানত বাড়িয়ে ব্যাংকের পরিস্থিতির উন্নতির চেষ্টা করে যাচ্ছি। ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছর ঋণ আদায় বেশি হয়েছে। বিনিয়োগ থেকে ভালো আয় এসেছে। তবে ৭০ ভাগ ঋণ খেলাপি হওয়ায় লোকসান বেড়েছে।’

বিশেষ ছাড়ে মুনাফা অগ্রণী ও রূপালীর

অগ্রণী ব্যাংকের আর্থিক চিত্র কিছুটা কৃত্রিম। ব্যাংকটি কাগজে-কলমে মুনাফা দেখালেও বাস্তবে বড় ধরনের মূলধন–সংকটে রয়েছে। ২০২৪ সালে অগ্রণী ব্যাংক ৯২৫ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছিল; আর গত বছরের শেষে ব্যাংকটি ৫৮ কোটি টাকা মুনাফা দেখিয়েছে। ব্যাংকটির বর্তমানে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার নিরাপত্তাসঞ্চিতির ঘাটতি রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, এই ঘাটতি পূরণ করার পর মুনাফা হিসাব করার কথা। এ অবস্থায় ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে নিরাপত্তাসঞ্চিতি সংরক্ষণে বিশেষ ছাড়সুবিধা নিয়েছে। তাতে লোকসান এড়িয়ে মুনাফা দেখাতে সক্ষম হয় অগ্রণী ব্যাংক। যদিও খেলাপি ঋণ বেশি হওয়ায় ব্যাংকটির প্রকৃত সুদ আয় এখন ঋণাত্মক।

একই পরিস্থিতি রূপালী ব্যাংকেরও। রাষ্ট্রমালিকানাধীন অন্য ব্যাংকের তুলনায় রূপালী ব্যাংকের আকার ছোট হলেও এটির সংকট অন্য ব্যাংকগুলোর মতোই। ২০২৪ সালে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল ১১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, গত বছরের শেষে তা কমে দাঁড়ায় ৬ কোটি ৮০ লাখ টাকায়। রূপালী ব্যাংকও চাহিদামতো নিরাপত্তাসঞ্চিতি রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিশেষ ছাড় বা সুবিধা নিয়ে ব্যাংকটি কিছুটা মুনাফা দেখিয়েছে।

রাষ্ট্রমালিকানাধীন এই চার ব্যাংকের মধ্যে সোনালী ছাড়া বাকি তিনটি ব্যাংকই বড় অঙ্কের নিরাপত্তাসঞ্চিতি ঘাটতিতে রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নিরাপত্তাসঞ্চিতি হিসেবে জমা রাখতে হয়, আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই বিধান রাখা হয়েছে; কিন্তু জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক এই সঞ্চিতি রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। তার পরও বাংলাদেশ ব্যাংক এই তিন ব্যাংককে নিরাপত্তাসঞ্চিতির ক্ষেত্রে ‘বিশেষ ছাড়’ দিয়েছে।