গণনবায়নে কমল খেলাপি ঋণ
ঋণ পুনঃ তফসিলকরণ ও পুনর্গঠনে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া বিশেষ সুবিধা অনেকেই কাজে লাগিয়েছেন। জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীরাও ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ নিয়েছেন। ফলে ব্যাংক খাতে গত অক্টোবর-ডিসেম্বর তিন মাসে খেলাপি ঋণ কমেছে ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকায় নেমে আসে, যা গত বছরের সেপ্টেম্বরে ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। গত তিন মাসে খেলাপি ঋণ ৩৫ দশমিক ৭৩ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।
এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান প্রথম আলোকে বলেন, বিশেষ নীতি সহায়তার প্রদানের ফলে অনেক খেলাপি ঋণ নিয়মিত হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য অনেক প্রার্থী ঋণ পুনঃ তফসিল করেছেন। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোও নিজস্ব উদ্যোগে অনেক ঋণ নিয়মিত করেছে। এতে খেলাপি ঋণ কমে এসেছে।
খেলাপি ঋণ কেন বেড়েছিল
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। তারা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে ২০২৪ সালের জুনে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সরকারের মেয়াদে ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র দেখানো শুরু হয়। আবার আওয়ামী লীগ–সমর্থিত অনেক গ্রাহক পালিয়ে যান। ফলে খেলাপি ঋণ হু হু করে বেড়ে যায়। এ অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ ছাড়ে ঋণ পুনঃ তফসিলের সুযোগ দেয়। তাতে খেলাপি ঋণ কমে আসে।
ব্যাংকারদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে অনিয়ম, জালিয়াতি, প্রতারণা ও দুর্নীতির উচ্চমাত্রার প্রভাবেই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পায়। এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, হল-মার্ক গ্রুপসহ কয়েকটি গোষ্ঠী এবং ন্যাশনাল, ইসলামী ও বেসিক ব্যাংকে সংঘটিত কেলেঙ্কারির ঘটনায় খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সবচেয়ে বেশি লুটপাটের শিকার হয় ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো। প্রচলিত ধারার কিছু ব্যাংকেও ঋণ নিয়ে বড় ধরনের অনিয়মের ঘটনা ঘটে। তাতে এসব ব্যাংকের অধিকাংশ ঋণই খেলাপি হয়ে যায়। দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে খেলাপির দিক থেকে শীর্ষ পাঁচ ব্যাংক ইউনিয়ন, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল, পদ্মা ও আইসিবি ইসলামী ব্যাংক। এর মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংকের খেলাপির হার ৯৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৯৬ দশমিক ২০ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৯৫ দশমিক ৭০ শতাংশ, পদ্মা ব্যাংকের ৯৪ দশমিক ১৭ শতাংশ ও আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ৯১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এই পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। এক্সিম ব্যাংক ছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে এবং বাকি চারটি ছিল চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের কর্ণধার ও বহুল আলোচিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলমের নিয়ন্ত্রণে। তাঁরা দুজনই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।
কীভাবে কমল
খেলাপি ঋণ হু হু করে বাড়তে থাকায় অন্তর্বর্তী সরকার ২ শতাংশ জমা দিয়ে ঋণ পুনঃ তফসিলের সুযোগ দেয়। পাশাপাশি প্রায় ৩০০ ব্যবসায়ীকে আরও ছাড়ে ঋণ নিয়মিত করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে প্রজ্ঞাপন দেয়, তাতে মূলত ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যবসা করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছে বা মার্কিন ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এমন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সুযোগ দেওয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠান চালু ও চাঙা করার উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোক ২ শতাংশ অর্থ জমা দিয়ে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেয়। এই ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর। ঋণ নিয়মিত হলে শুরুতে দুই বছর ঋণ পরিশোধে বিরতি মিলে।
খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি
গত সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকেগুলোয় খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯১ কোটি টাকা, যা ডিসেম্বরে কমে হয় ১ লাখ ৪৬ হাজার ১০৭ কোটি টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণ সেপ্টেম্বরে ছিল ৪ লাখ ৬৩ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা, ডিসেম্বের যা কমে হয় ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা। বিদেশি ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণ সেপ্টেম্বরে ছিল ৩ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা, যা ডিসেম্বরে কমে হয় ২ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া বিশেষায়িত কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ সেপ্টেম্বেরে ছিল ১৯ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা, যা ডিসেম্বের কমে হয়েছে ১৮ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা।
এদিকে দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণ আদায়ে চমক দেখিয়েছে ব্যাংক এশিয়া। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ২০২৫ সালের মাঝামাঝিতে সাময়িকভাবে বেড়ে ১৯ শতাংশে পৌঁছায়। তবে নানা কৌশল ও সাহসী পদক্ষেপের ফলে গত বছর শেষে তা কমে ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসে।
এ নিয়ে ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সোহেল আর কে হুসেইন প্রথম আলোকে বলেন, ‘অল্প টাকা জমা নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ পুনঃ তফসিলের পরিবর্তে আমরা বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করি। এতে আমরা সফলতা পেয়েছি। ঋণ আদায় ও ঋণের গুণগত মানের উন্নতি হয়েছে। তাতে ব্যাংকের ভিত্তিও মজবুত হয়েছে।’