বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রভাব খাটাতে চায় না সরকার, বললেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, বর্তমান সরকার কোনোভাবেই বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রভাব খাটাতে চায় না। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজে পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। আর তথাকথিত কেতাবি কায়দায়ও বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালিত হবে না।
আজ বুধবার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘ব্যাংকিং খাতের সমন্বয়: ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক এক ফোকাস গ্রুপ আলোচনায় এ কথা বলেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার; বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক (গবেষণা) মো. আবদুল ওয়াহাব, পরিচালক নওশাদ মোস্তফা ও সেলিম আল মামুন; এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম শামসুল আরেফিন, সিটি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আশানুর রহমান প্রমুখ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘আমরা কোনোমতেই কোনোভাবে বাংলাদেশ ব্যাংককে “ডিক্টেট” করতে চাই না। বরং রাজস্ব ও মুদ্রানীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করবে সরকার।’
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক–সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বাংলাদেশ ব্যাংক আপনাদের (ব্যবসায়ী) কাছ থেকে শুনবে এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। আমরা রাজস্ব ব্যবস্থাপনা থেকে আপনাদের জন্য, বিশেষ করে এসএমই খাতে অনেকগুলো পদক্ষেপ আগামী বাজেটে নেব। এটা প্রণোদনার মাধ্যমে হতে পারে, করকাঠামোর মাধ্যমে হতে পারে কিংবা অনেকগুলো যৌথ তহবিল গঠনের বিষয়ও হতে পারে।’
জনগণের কাছে দায়বদ্ধতার কারণে সরকার মাশুল দিচ্ছে বলে অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, ‘ইউক্রেন যুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম কমলেও তৎকালীন (আওয়ামী লীগ) সরকার জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ ছিল না। সে জন্য তারা বারবার দাম বাড়িয়েছে এবং বিদেশে অর্থ পাচারের ঘাটতি মেটাতে সাধারণ মানুষের ওপর লুটপাট চালিয়েছে। সেই সরকারের শাসনকালের অদূরদর্শিতা ও দায়বদ্ধতাহীনতার এক বিশাল মাশুল এখন আমাদের বর্তমান সরকারকে দিতে হচ্ছে। কারণ, বর্তমান সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ।’
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বর্তমান সরকার যেহেতু বিপুল জনরায় নিয়ে সরকার পরিচালনায় এসেছে, তাই বৈশ্বিক সংকটের অভিঘাতে দেশে মানুষের জীবনযাত্রার কষ্ট যেন লাঘব হয়, সেই বিষয়টিকে বেশি হারে প্রাধান্য দিচ্ছে সরকার। এ কারণে জ্বালানি তেলের দাম এখনো বাড়ানো হয়নি।
অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা–সহায়ক পরিস্থিতি না থাকায় শিল্প খাতে উৎপাদন ঠিকভাবে হচ্ছে না। এতে শিল্পের বকেয়া ঋণ ক্রমে বাড়ছে। অন্যদিকে খেলাপি ঋণ বাড়ায় ব্যাংকগুলো এখন ব্যবসায়িক ঋণের চেয়ে ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের ব্যাংক খাতে এখন তারল্যের সংকট নেই; বরং রেকর্ড ৩ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার বেশি তারল্য রয়েছে। এরপরও বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে ৬ দশমিক ০৩ শতাংশে নেমেছে। বর্তমানে শিল্প খাতের মোট ঋণের ৫০ দশমিক ৪৬ শতাংশ অনাদায়ি এবং খেলাপি ঋণের হার ৩১ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে ব্যাংকগুলো এখন চরম আতঙ্কে ভুগছে। সেই সঙ্গে এসএমই উদ্যোক্তাদের নেওয়া ঋণের ৩৫ দশমিক ৪৩ শতাংশও সময়মতো পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায়, তা খেলাপি হয়ে গেছে। বর্তমানে প্রতি তিনজন সিএমএসএমই ঋণগ্রহীতার একজনের বেশি ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছেন।
বিএবি চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার বলেন, ‘জ্বালানিসংকট আমাদের জন্য একটি বড় সমস্যা। দেখা গেছে, যেসব এলাকায় জ্বালানিসংকট বেশি, সেখানে ব্যাংকে (ঋণ আদায়) সমস্যাও বেশি।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক (এসএমই ও স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগ) নওশাদ মোস্তফা বলেন, ‘আর্থিক খাতে আমাদের প্রকৃত তথ্যের প্রচুর ঘাটতি রয়েছে। এতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হয়।’
এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম শামসুল আরেফিন বলেন, বর্তমানে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়টিকে ব্যাংকগুলোকে প্রাধান্য দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা এ ধরনের ব্যবসায় এগিয়ে এলে সহজে ঋণ পাবেন।