বাংলাদেশ ব্যাংকের করা টেকসই রেটিংয়ে দেশের সেরা দশ ব্যাংকের একটি ব্র্যাক ব্যাংক। প্রথাগত ব্যাংকিং কার্যক্রমের পাশাপাশি কীভাবে টেকসই ব্যাংকিং কার্যক্রমের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন?
তারেক রেফাত উল্লাহ খান: ব্র্যাক ব্যাংকে আমরা টেকসই উন্নয়নকে কোনো আলাদা উদ্যোগ হিসেবে দেখি না, বরং এটি আমাদের ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু। বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ টেকসই ব্যাংকের তালিকায় টানা পাঁচ বছর স্থান পাওয়া আমাদের জন্য গর্বের। একই সঙ্গে বিশ্বখ্যাত আর্থিক তথ্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ব্লুমবার্গও সম্প্রতি বাংলাদেশের সেরা টেকসই প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছে। এসব অর্জন আমাদের ব্যবসায়িক অগ্রাধিকার, ঋণ অনুমোদন, অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম ও গ্রাহক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় টেকসই ভাবনার সুসংহত প্রয়োগ। বর্তমানে আমাদের মোট ঋণের ৮২ শতাংশ টেকসই অর্থায়নের আওতাভুক্ত। এর মধ্যে পরিবেশবান্ধব অর্থায়ন আমাদের মোট মেয়াদি ঋণের ২০ শতাংশ। আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা, পরিবেশবান্ধব স্থাপনায় অর্থায়নে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি। অভ্যন্তরীণভাবেও আমরা পরিবেশবান্ধব কার্যালয়ের নীতিমালা অনুসরণ করি। এসব উদ্যোগ বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ—উভয় দিক থেকেই আমাদের পরিবেশগত দায়িত্ববোধের প্রতিফলন।
”ব্র্যাক ব্যাংক নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব ভবন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো খাতে ৯১০ কোটি টাকার বেশি অর্থায়ন করেছে।
বর্তমান বিশ্বে যেকোনো প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ও নীতিনির্ধারণে পরিবেশ, সমাজ এবং সুশাসন (ইএসজি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই পরিবর্তনশীল বিষয়গুলোর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ব্র্যাক ব্যাংক কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত রাখছে?
তারেক রেফাত উল্লাহ খান: ব্র্যাক ব্যাংক তার কার্যক্রমের সব ক্ষেত্রে ইএসজি নীতিমালা গ্রহণ ও প্রসারে পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা নিয়মিতভাবে বৈশ্বিক সর্বোত্তম চর্চার সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যক্রম পরিচালনা করছি। প্রতিবেদন প্রণয়নে আমরা জিআরআই, পিসিএএফ ও আইএসএসবির মতো আন্তর্জাতিক স্বীকৃত বিভিন্ন কাঠামো অনুসরণ করি। ব্র্যাক ব্যাংক বাংলাদেশের প্রথম ব্যাংক হিসেবে একটি নিরপেক্ষ আইএফআরএস এস ১ ও এস ২ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা বৈশ্বিক ইএসজি মানদণ্ড বজায় রেখে তৈরি করা হয়েছে।
দেশের এসএমই অর্থায়নে ব্র্যাক ব্যাংক শুরু থেকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। আপনাদের এসএমই উদ্যোগগুলো টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?
তারেক রেফাত উল্লাহ খান: বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা (এসএমই)। টেকসই উন্নয়নের জন্য তাদের প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের টেকসই অর্থায়ন পোর্টফোলিওতে সামাজিক অর্থায়ন একটি বড় অংশ। দেশের সবচেয়ে বড় এসএমই ব্যাংক হিসেবে ব্র্যাক ব্যাংক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, খাদ্যনিরাপত্তা, সাশ্রয়ী আবাসন ইত্যাদি খাতে নিয়মিত অর্থায়ন করে থাকে। আমাদের টেকসই অর্থায়ন পোর্টফোলিও ৫০ হাজার ২১৫ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। যার একটি বড় অংশ এসএমই, নারী উদ্যোক্তা ও গ্রামীণ ব্যবসাকে সহায়তা করছে। আমরা বাংলাদেশে প্রথম বেসরকারি খাতের সোশ্যাল বন্ড ইস্যুর প্রস্তুতিও নিচ্ছি। যার মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য অর্থায়ন করা হবে। অর্থায়নের বাইরেও আমরা উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা ও আর্থিক সাক্ষরতা বাড়াতে বিনিয়োগ করছি, যাতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে ওঠে।
পরিবেশবান্ধব টেকসই উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে ব্র্যাক ব্যাংক কী কী উদ্যোগ বা উদ্ভাবন গ্রহণ করেছে?
তারেক রেফাত উল্লাহ খান: পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধ আমাদের টেকসই অঙ্গীকারের একটি প্রধান স্তম্ভ। ব্র্যাক ব্যাংক নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব ভবন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো খাতে ৯১০ কোটি টাকার বেশি অর্থায়ন করেছে। আমরা আমাদের নেটওয়ার্কজুড়ে ৫০টি ‘সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স হেল্পডেস্ক’ স্থাপন করেছি, যাতে প্রকল্প খোঁজা, পুনঃ অর্থায়ন ও নিয়ন্ত্রক সহায়তা সহজ হয়।
আমরা পরিবেশগত প্রভাব আরও কমাতে বিদ্যুৎ–সাশ্রয়ী ডিজিটাল শাখার দিকে
অগ্রসর হচ্ছি।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে ব্র্যাক ব্যাংকের নেওয়া উদ্যোগগুলো শুধু উদ্যোগের মধ্যে যাতে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেটি কীভাবে নিশ্চিত করছেন?
তারেক রেফাত উল্লাহ খান: ব্র্যাক ব্যাংকের কাছে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কেবল ব্যাংকিং সেবা পাওয়ার সুযোগের বিষয় নয়, এটি সত্যিকারের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার বিষয়। আমাদের বিশেষ ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম ‘তারা’ নারী গ্রাহকদের উপযোগী আর্থিক সমাধান দেয়। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা কম পাওয়া জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং কাঠামোর আওতায় আনা হচ্ছে। ব্যাংকিং খাতের মোট নারী উদ্যোক্তার প্রায় ২৫ শতাংশকেই সেবা দিতে পেরে আমরা গর্বিত। প্রতিবছর আমরা ৩ হাজারের বেশি নারী নেতৃত্বাধীন এসএমইকে প্রশিক্ষণ দিই। তাদের মধ্যে ৬০০-এর বেশি উদ্যোক্তাকে বাজারে প্রবেশের সুযোগ করে দিই। এই উদ্যোগগুলো বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলের নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে আর্থিক স্থিতিশীলতা আনতে ও আত্মনির্ভরতা তৈরি করার লক্ষ্যে করা হয়েছে।