ইসলামি ব্যাংকগুলোতে আমানত কমেছে কেন
দেশের ব্যাংকিং খাতে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর সংকট এখনো কাটেনি। এসব ব্যাংকের আমানত যেমন কমছে, একইভাবে আগের চেয়ে এসব ব্যাংকে প্রবাসী আয়ও কম এসেছে। এক বছরের ব্যবধানে ইসলামি ধারার ব্যাংকে আমানত কমেছে ৪ হাজার ২০১ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গত জুন মাসের পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২৫ সালের জুন মাসের তুলনায় অধিকাংশ সূচকে এই ব্যাংকগুলোতে মিশ্র প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে আমানত ও রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের পতন হয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ধারার ১০টি ব্যাংক হলো ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক।
সংশ্লিষ্টরা বলছে, ইসলামি ধারার ১০ ব্যাংকের মধ্যে পাঁচটি একীভূত হয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন হচ্ছে। এর ফলে এই পাঁচ ব্যাংক এখনো আস্থাহীনতায় রয়ে গেছে।
কেন আমানত কমেছে
ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর আমানত কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ, একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের দুর্বল পারফরম্যান্স। এসব ব্যাংকে এখন আমানতকারীদের জমানো টাকার পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা, যা ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোয় রাখা মোট আমানতের প্রায় ৩৬ শতাংশের বেশি।
ওই পাঁচ ব্যাংকে এখন গ্রাহকেরা আমানত রাখতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। বলা যায়, একদম আগ্রহ কম। এ কারণ ওই পাঁচটি ব্যাংকের গ্রাহকেরা নিজেদের চাহিদামতো টাকা তুলতে পারছেন না। একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত তোলার সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ফলে এসব ব্যাংক আমানত রেখে আটকে যাওয়ার শঙ্কা আছে গ্রাহকদের মধ্যে। উল্টো এসব ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেওয়ার প্রবণতাই বেশি। এসব কারণে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর আমানতে প্রভাব ফেলছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ওই পাঁচটি ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ঋণের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাটের অভিযোগ আছে। এ ছাড়া তৎকালীন সরকার–ঘনিষ্ঠ সমালোচিত ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলম চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।
এ ছাড়া প্রবাসীদের অনেকের মধ্যে এসব ব্যাংকে রেমিট্যান্সের অর্থ পাঠানোয় অনাগ্রহ আছে। কারণ, রেমিট্যান্সের অর্থ ঠিকমতো তোলা যাবে কি না, তা নিয়ে তাঁরা অনিশ্চয়তায় ভোগেন।
এ ছাড়া যেকোনো ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি মজবুত না হলে গ্রাহকেরা আমানত রাখতে নিরুৎসাহিত হন।
কমেছে আমানত ও প্রবাসী আয়
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জুন শেষে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকের মোট আমানতের (আন্তব্যাংক ও ইডিএফ বাদে) পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে আমানত ছিল ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৭৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমানত কমেছে ৪ হাজার ২০১ কোটি টাকা।
তথ্য অনুসারে, আমানতকারীরা এখনো মুদারাবাভিত্তিক আমানত স্কিমগুলোর ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভর করছেন, যা মোট ইসলামি ব্যাংকিং আমানতের প্রায় ৮৭ শতাংশ। এ ছাড়া ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানতের মূল উৎস হচ্ছে বেসরকারি খাত, যা মোট আমানতের প্রায় ৯০ শতাংশ।
ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর আমানত কমলেও এর মধ্যে ভালো করছে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, আমানতে ১১ শতাংশ ও বিনিয়োগে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আছে। পরিচালন মুনাফায় প্রবৃদ্ধি আছে ১৫ শতাংশ। ঋণ-বিনিয়োগ অনুপাত ৯২ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে, তবে এখন ৮২১ শতাংশ আছে। এখনো ৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করার মতো তহবিল আছে।
মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ বলেন, বিনিয়োগ পরিস্থিতি অনুকূলে না। তাই অনেক বুঝেশুনে বিনিয়োগের চিন্তা করছেন বিনিয়োগকারীরা। আমানতকারীদের কাছ ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম উৎস রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের জুন মাসে বড় ধরনের ধস নেমেছে। জুন মাসে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে দেশে এসেছে মাত্র ৪৪ কোটি ডলার। ২০২৫ সালের জুনে এসেছিল ৬০ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স কমেছে প্রায় ২৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে জুন মাসে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৬০ কোটি ডলার, গত বছরের জুনে ছিল ৫৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার। অন্যদিকে গত জুনে আমদানি ব্যয় হয়েছে ৭৫ কোটি ডলার, যা ২০২৫ সালের জুনে যা ছিল ৭৪ কোটি ডলার। আমদানি ও রপ্তানিতে কিছুটা প্রবৃদ্ধি আছে।
বিনিয়োগে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি
আমানত কমলেও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকগুলো ইতিবাচক ধারা বজায় রেখেছে। ২০২৬ সালের জুন শেষে এই ব্যাংকগুলোর মোট বিনিয়োগের (সুকুক বা ইসলামি বন্ডসহ) পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪২ হাজার ১৪১ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের জুনে যা ছিল ৫ লাখ ২৩ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিনিয়োগ বেড়েছে ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
মোট বিনিয়োগের বড় একটি অংশ ব্যয় হয়েছে শিল্প খাতে, যা ৪১ শতাংশের বেশি। আর ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে বিনিয়োগ ৩০ শতাংশের বেশি।
কমছে জনবল
২০২৬ সালের জুন শেষে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকগুলোতে কর্মরত ছিলেন মোট ৪২ হাজার ৬১২ কর্মী। ২০২৫ সালের জুনে যা ছিল ৪৬ হাজার ৪৬৮ জন অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এই ব্যাংকগুলোতে ৩ হাজার ৮৫৬ জন কর্মী কমেছে। গত দুই বছরের নানা অস্থিরতা এবং আগের নিয়োগগুলো যাচাই–বাছাইসহ নানা কারণে জনবল কমিয়েছে ব্যাংকগুলো।
ইসলামি ব্যাংক খাত
বর্তমানে দেশে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক। তাদের মোট ১ হাজার ৭০০ শাখা রয়েছে। ব্যাংকগুলো হলো ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক পিএলসি ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক।
এর মধ্যে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠিত হচ্ছে এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে। আর্থিক সংকটে থাকা এসব ব্যাংককে ব্যাংক রেজোল্যুশন প্রক্রিয়ার আওতায় এনে নতুন ব্যাংকটি গঠন করা হয়। ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নামে চূড়ান্ত লাইসেন্স দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। একীভূত পাঁচ ব্যাংকের নেটওয়ার্ক নিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আওতায় রয়েছে সারা দেশে ৭৬০টি শাখা, ৬৯৮টি উপশাখা, ৫১১টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট ও ৯৭৫টি এটিএম বুথ।