মানুষের লেনদেনের অভ্যাস বদলে দিয়েছে বিকাশ

প্রতিষ্ঠার ১৫ বছরে প্রায় ৮ কোটি গ্রাহক। প্রতি সেকেন্ডে গড়ে ২৭৭ বার ও প্রতি মিনিটে ২ কোটি টাকার বেশি লেনদেন। বিদায়ী বছরে নিট মুনাফা ৬৬১ কোটি টাকা। এ যেন এক ফিনটেক (আর্থিক প্রযুক্তি) বিপ্লবের গল্প। তবে এটি গল্প নয়, সত্যি। আর্থিক খাতে এই বৈপ্লবিক রূপান্তর এনেছে মোবাইলে আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান (এমএফএস) ‘বিকাশ’।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির যত গ্রাহক হয়েছে, দেশের একক কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এর অর্ধেক গ্রাহকও নেই। দেশের বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় ব্যাংকটির গ্রাহক তিন কোটির কিছু বেশি। এমনকি দেশের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোনের গ্রাহক সংখ্যা গত জুন শেষে ছিল ৮ কোটি ৬৩ লাখ। মুঠোফোনের ক্ষেত্রে একজন গ্রাহকের একাধিক সিম ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বিকাশের গ্রাহক ইউনিক। অর্থাৎ একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে একটিই হিসাব। সেই হিসাবে ইউনিক গ্রাহক বিবেচনায় গ্রামীণফোনের চেয়েও বিকাশের গ্রাহক সংখ্যা বেশি।

বিকাশের গ্রাহক হলে এক অ্যাপে আর্থিক লেনদেনের শত সুবিধা পান গ্রাহকেরা। আবার ব্যাংক হিসাব খুলতে গেলে টাকা লাগে। সেখানে বিকাশে হিসাব খুলতে কোনো মাশুল দিতে হয় না। শুধু একটি স্মার্টফোন বা বাটন ফোনই হিসাব খোলার জন্য যথেষ্ট। ফলে শহর-গ্রাম, ধনী-গরিব, ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান নির্বিশেষে সবাই বিকাশের গ্রাহক। দৈনন্দিন জীবনযাপনে নগদ টাকার বিকল্প হয়ে উঠেছে মুঠোফোন ও বিকাশ যেন এখন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে।

প্রযুক্তিভিত্তিক আর্থিক সেবাদাতা এই প্রতিষ্ঠান ২০১১ সালে যখন যাত্রা শুরু করে, তখন মুঠোফোনে টাকা পাঠানো ছিল অবিশ্বাস্য ধারণা। ব্যাংকের বাইরে তখন এ দেশের মানুষের কাছে টাকা পাঠানোর অন্যতম মাধ্যম ছিল কুরিয়ার সেবা বা ডাকঘর। তাতে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে টাকা পৌঁছাতে সময় লাগত কয়েক দিন। এ ছাড়া সরকারি বিভিন্ন সেবার বিল পরিশোধে বা ব্যাংকে আমানত জমা করতে মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হতো। সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে দিয়েছে বিকাশ। ২০০টির বেশি সেবা পাওয়া যায় এখন মুঠোফোনে বিকাশের অ্যাপে। এ কারণে এটি এখন দেশের প্রধান ‘সুপার অ্যাপ’। শুধু আর্থিক সেবা নয়, অ্যাপের মাধ্যমে নির্দিষ্ট গ্রাহকেরা তাৎক্ষণিক পাচ্ছেন অতি ক্ষুদ্রঋণ। এই ঋণসেবা চালুর পর থেকে ৩৫ লাখ গ্রাহক এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন। গড়ে প্রতিদিন ঋণ পাচ্ছেন এক লাখ মানুষ। পাশাপাশি সঞ্চয়ও করতে পারছেন বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে। সব মিলিয়ে বিকাশ এখন দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবনযাপনের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান প্রথম আলোকে বলেন, একজন রিকশাচালক দিনভর পরিশ্রম করে সন্ধ্যায় পরিবারের কাছে টাকা পাঠাতে পারেন। ফলে মানুষের অনেক উন্নতি হয়েছে। নগদ টাকার চাহিদা মিটিয়ে বিকাশ সবার ঘরে ঘরে প্রবেশ করেছে৷ এটা বাংলাদেশের জন্য যুগান্তকারী ঘটনা।

আনিস এ খান আরও বলেন, বিকাশ আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগ আসছে, বাংলাদেশের মানুষের উপকার হচ্ছে। আশা করি, সামনের দিনে বিকাশের মাধ্যমে মানুষের উপকার করার মতো সুবিধা আসবে। এতে বাংলাদেশের আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে।

গত ১৫ বছরে প্রতিষ্ঠানটির অর্জন নিয়ে বিকাশের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কামাল কাদীর প্রথম আলোকে বলেন, দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে মানুষ তাঁর প্রয়োজনীয় ডিজিটাল লেনদেন বিকাশ দিয়ে করতে পারছেন। বিশাল জনগোষ্ঠীকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে দৈনন্দিন লেনদেনে সক্ষম ও স্বাধীন করে তোলা বিকাশের বড় অর্জন।

কামাল কাদীর আরও বলেন, ক্যাশলেস বা নগদবিহীন বাংলাদেশ গড়ার যাত্রায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সঙ্গে নিয়ে শক্তিশালী ডিজিটাল ইকোসিস্টেম তৈরিতে ভূমিকা রাখছে বিকাশ। ফলে সব শ্রেণির গ্রাহকের লেনদেন ব্যবস্থাপনায় বিকাশ হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় আস্থার মাধ্যম।

প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ব্র্যাক ব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানি ইন মোশনের যৌথ উদ্যোগে ২০১১ সালের ২১ জুলাই যাত্রা শুরু করে বিকাশ। সূচনা পর্বে কর্মী ছিলেন মাত্র ৩৭ জন, আর সেবা ছিল তিনটি—ক্যাশ-ইন, ক্যাশ-আউট ও সেন্ড মানি। এখন কর্মী সংখ্যা ৩ হাজারের বেশি। আর প্রায় ৮ কোটি ৪০ লাখ নিবন্ধিত গ্রাহকের এক বিশাল পরিবার, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। শুরুর কয়েক বছরের লোকসানে চলা প্রতিষ্ঠানটি এখন বড় অঙ্কের মুনাফা করা প্রতিষ্ঠান। দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গত বছর মুনাফা অর্জনকারী শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের একটি বিকাশ।

আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিকাশের বড় সাফল্য ব্যাংকিং সেবাকে সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয় পৌঁছে দেওয়া। দেশের আনাচকানাচে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার এজেন্ট কাজ করছেন ‘হিউম্যান এটিএম’ হিসেবে। বিকাশের মাধ্যমে প্রবাসী আয় ও শহরের টাকা সহজে গ্রামে পৌঁছানোয় চাঙা হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি। তৈরি পোশাক খাতের ১ হাজার ৩০০ প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এখন বিকাশের মাধ্যমে বেতন পাচ্ছেন, যাঁদের ৬০ শতাংশই নারী। এ ছাড়া সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর সরকারি ভাতাও যাচ্ছে বিকাশে। ইতিমধ্যে প্রায় ৭০ লাখ গ্রাহক বিকাশের মাধ্যমে ডিপিএস ও সঞ্চয় হিসাব খুলেছেন।

দেশীয় জনবলের ওপর নির্ভর প্রতিষ্ঠানটি এখন আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এটির মালিকানায় রয়েছে বিশ্বব্যাংকের প্রতিষ্ঠান আইএফসি, যুক্তরাষ্ট্রের গেটস ফাউন্ডেশন, চীনের আলিবাবা গ্রুপের মালিকানাধীন অ্যান্ট ইন্টারন্যাশনাল ও জাপানের সফটব্যাংক। বিকাশে তাদের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৮ কোটি ১০ লাখ ডলার।

আর্থিক খাতে বিকাশের অন্তর্ভুক্তির প্রভাব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনুসর প্রথম আলোকে বলেন, গত ১৫ বছরে এমএফএস খাতে বিকাশ খুবই ভালো করেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে বিকাশ যতটা বিকশিত হয়েছে, খাতটি ততটি হয়নি। বিকাশের মতো প্রতিষ্ঠান থাকার পরও আমাদের দেশে নগদ অর্থের ব্যবহার বাড়ছে। খুব ভালো হতো আমরা যদি বিকাশের মতো চার–পাঁচটি ভালো প্রতিষ্ঠান এই খাতে দাঁড় করাতে পারতাম। কিন্তু আমাদের নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতা ও পরিকল্পনার অভাবে সেটি হয়নি। ১৫ বছরে বিকাশের অনেক সাফল্যের পরও বড় ব্যর্থতা এখনো এই খাতের লেনদেনের বড় অংশ এজেন্টনির্ভর ক্যাশ ইন ও ক্যাশ আউট। বিকাশের উচিত এখন তাদের লেনদেনকে পুরোপুরি মার্চেন্ট অ্যাকুজিশনে রূপান্তর করা, যাতে নগদ লেনদেন কমে আসে।