সিএসআর ব্যয়ের শীর্ষে ঢাকা ব্যাংক, এরপরই স্ট্যানচার্ট ও শাহজালাল ইসলামী

ব্যাংকগুলো তাদের মুনাফার একটি অংশ করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতে ব্যয় করে থাকে। এই অর্থ দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, ক্রীড়াসহ নানা খাতে দেওয়া হয়। ফলে খাতগুলোতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। কিন্তু এ বছর ব্যাংকগুলো তাদের সিএসআর ব৵য় কমিয়ে দিয়েছে।

সিএসআর খাতে ব্যয় কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে ব্যাংকগুলোর এখনো আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত অনিয়ম-দুর্নীতির নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে উঠতে না পারার কথা বলা হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেসব ব্যাংক আগে সিএসআর ব্যয়ে এগিয়ে ছিল, তার অনেকগুলোই এখন লোকসানে রয়েছে বা মুনাফায় বড় ধাক্কা খেয়েছে। আবার কোনো কোনোটি মুনাফা কমায় সিএসআর ব্যয় কমিয়েছে। সব মিলিয়ে এই খাতে সিএসআর ব্যয় কমে গেছে। যেমন, চলতি বছরের প্রথমার্ধে ব্যাংকগুলো করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতে ১১৩ কোটি টাকা খরচ করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় কমেছে ৩১ কোটি টাকা বা ২৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ কম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে সিএসআর ব্যয়ে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা ব্যাংক। এরপরই বহুজাতিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক (স্ট্যানচার্ট) ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের অবস্থান।

এ নিয়ে জানতে চাইলে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের ব্যয়ের বড় অংশ গেছে শীতের কম্বলের পেছনে। এ ছাড়া আমরা শিক্ষার্থীদের বছরজুড়ে বৃত্তি দিয়ে থাকি। বৃত্তিপ্রাপ্তদের জন্য পুরো শিক্ষাজীবনের খরচ দিয়ে থাকি। এ জন্য আমাদের পুরো বছরই খরচ করতে হয়। এই ব্যয় দেশের টেকসই উন্নয়নে অবদান রেখে যাচ্ছে।’

আমাদের ব্যয়ের বড় অংশ গেছে শীতের কম্বলের পেছনে। এ ছাড়া আমরা শিক্ষার্থীদের বছরজুড়ে বৃত্তি দিয়ে থাকি। বৃত্তিপ্রাপ্তদের জন্য পুরো শিক্ষাজীবনের খরচ দিয়ে থাকি। এ জন্য আমাদের পুরো বছরই খরচ করতে হয়।
মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ, এমডি, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক।

সিএসআর ব্যয়ের নিয়মকানুন

দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী কোনো ব্যাংক নিট লোকসানে থাকলে সিএসআর খাতে কোনো অর্থ ব্যয় করতে পারে না। নিয়ম অনুযায়ী একটি ব্যাংক ১০০ টাকা সিএসআর ব্যয় করলে তার মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ৩০ শতাংশ করে মোট ৬০ শতাংশ; পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন খাতে ২০ শতাংশ এবং আয়-উৎসারী কাজ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, ক্রীড়া, সংস্কৃতিসহ অন্যান্য খাতে বাকি ২০ শতাংশ খরচ করতে পারে।

২০১৫ সালে দেশে কার্যরত ব্যাংকগুলো সিএসআর খাতে ব্যয় করেছিল ৫২৭ কোটি টাকা, যা ২০১৬ সালে কমে হয় ৪৯৭ কোটি টাকা। তবে ২০১৭ সালে সিএসআর ব্যয় ৭৪৪ কোটিতে উন্নীত হয়, যা ২০১৮ সালে ৯০৫ কোটি, ২০১৯ সালে ৬৪৮ কোটি, ২০২০ সালে ৯৬৮ কোটি ও ২০২১ সালে ৭৫৯ কোটি টাকা হয়। ২০২২ সালে ব্যাংকগুলো সিএসআর ব্যয় করে ১ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা, যা ২০২৩ সালে ৯২৪ কোটিতে নামে এবং ২০২৪ সালে আরও কমে ৬১৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকায় এবং ২০২৫ সালে মাত্র ৩৪৫ কোটি টাকায় নেমে যায়।

চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন ছয় মাসে ব্যাংকগুলো এই খাতে খরচ করেছে ১১৯ কোটি টাকা, যা এর আগের ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৫) ছিল ১৯৮ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুন ছয় মাসে অবশ্য ব্যাংকগুলো খরচ করেছিল ১৫০ কোটি টাকা।

ব্যয়ে এগিয়ে কোন কোন ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে আলোচ্য সময়ে সিএসআর খাতে সর্বোচ্চ ১২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা খরচ করেছে ঢাকা ব্যাংক। এই ব্যয়ের সিংহভাগই গেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য সামাজিক উন্নয়ন উপখাতে। এর মধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উপখাতেই তারা সর্বোচ্চ ৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা খরচ করেছে। এ ছাড়া ক্রীড়া ও সংস্কৃতি উপখাতে ২ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য খাতে ৭৯ লাখ টাকা এবং শিক্ষা খাতে ৭৭ লাখ টাকা ব্যয় করেছে।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয় করেছে বহুজাতিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। ব্যাংকটি মোট ব্যয়ের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা খরচ করেছে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমন ও অভিযোজন খাতে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য খাতে ২ কোটি ৯৪ লাখ, শিক্ষায় ১ কোটি ৯১ লাখ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ১ কোটি ১৪ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়নে ২১ লাখ টাকা এবং অন্যান্য উপখাতে ৪৯ লাখ টাকা খরচ করেছে।

শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের সিএসআর ব্যয় ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা তৃতীয় সর্বাধিক। ব্যাংকটির সিএসআর বাজেটের বড় অংশই গেছে দুর্যোগ মোকাবিলা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে। এ ব্যাংক ৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা খরচ করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উপখাতে। এ ছাড়া শিক্ষা খাতে ২ কোটি ৩১ লাখ, স্বাস্থ্যে ৮৬ লাখ, অবকাঠামো উন্নয়নে ১৩ লাখ এবং পরিবেশ ও জলবায়ু উপখাতে ৫ লাখ টাকা খরচ করেছে ব্যাংকটি।

সিএসআর ব্যয়ে চতুর্থ স্থানে আছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)। তারা খরচ করেছে ৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এ ছাড়া পূবালী ব্যাংক ৮ কোটি ৬৭ লাখ, ট্রাস্ট ব্যাংক ৮ কোটি ৪৩ লাখ, যমুনা ব্যাংক ৮ কোটি ৭ লাখ, ব্র্যাক ব্যাংক ৭ কোটি ৪১ লাখ, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ৬ কোটি ৩৮ লাখ ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ৬ কোটি ৮ লাখ টাকা খরচ করেছে।

আলোচ্য ছয় মাসে ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৪৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা খরচ করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি খাতে। এরপর স্বাস্থ্য খাতে ৩৪ কোটি ৬৬ লাখ এবং শিক্ষায় ২৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা খরচ করেছে।

ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা জানান, প্রতিটি ব্যাংকের নিজস্ব কিছু সিএসআর খরচ রয়েছে। কেউ হাসপাতাল, কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বৃত্তি ও কেউ ক্রীড়া ক্ষেত্রে বছরজুড়ে খরচ করে থাকে। এর বাইরে দেশের বড় কোনো আয়োজন হলে সেখানে ব্যাংকগুলোকে অর্থায়ন করতে হয়। এবারও তাই হয়েছে বলে কেউ কেউ জানান।