বাংলা কিউআর জনপ্রিয় করতে যত বাধা, কী করতে হবে

ডিজিটাল লেনদেনপ্রতীকী ছবি

ডিজিটাল অর্থনীতি বা ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে ‘বাংলা কিউআর’ (কুইক রেসপন্স) সেবা চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির নির্দেশে দেশের সব ব্যাংক ও মোবাইলে আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান (এমএফএস) তাদের নিজস্ব কিউআর কোড বদলে বাংলা কিউআর চালু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে লক্ষ্য বেঁধে দিয়ে ব্যাংক ও এমএফএসগুলোকে মাঠে নামানো হয়েছে, যাতে দ্রুত ক্রেতা ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলা কিউআরের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ শুরু করে। অর্থ গ্রহণকারীদের খরচ কমাতে গঠন করা হয়েছে ১০০ কোটি টাকার তহবিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান গত তিন মাসে ১০টিরও বেশি বাংলা কিউআরের প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন।

এত উদ্যোগের পরও সেবাটি কাঙ্ক্ষিত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে না। ব্যাংক ও এমএফএস গ্রাহকদের কিউআর কোড নিয়ে খুব বেশি আলোচনা তৈরি হয়নি। বিক্রেতাদের বেশির ভাগের মধ্যে এখনো ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ গ্রহণে অনীহা রয়েছে। ব্যাংক, এমএফএস ও পণ্য বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ইন্টারনেট ব্যাংকিং, কার্ড ও এমএফএসের দিনে হাজার টাকার ক্যাশলেস কেনাকাটা ও লেনদেন হলেও বাংলা কিউআরের মাধ্যমে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ ১০০ কোটি টাকার নিচে। তবে ধীরে ধীরে কিউআর কোডে লেনদেন ও ব্যবহারকারী মার্চেন্টের সংখ্যা বাড়ছে।

কেন জনপ্রিয় হচ্ছে না

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, খুচরা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল লেনদেনে অনীহার অন্যতম প্রধান কারণ কর ব্যবস্থার ভয়। আয়করের পরিবর্তে মোট বিক্রির ওপর ভিত্তি করে ন্যূনতম টার্নওভার কর আরোপের ফলে অনেক ব্যবসায়ী লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ড রাখতে ভয় পাচ্ছেন। ন্যূনতম কর এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে লোকসান হলেও এই কর দিতে হয়। তাই ডিজিটাল লেনদেনে বেশি ভয় কাজ করছে ছোট ব্যবসায়ীদের মধ্যে। কারণ, তাঁরা এখনো করের আওতার বাইরে রয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে বাংলা কিউআরের লেনদেনে ১ শতাংশ মার্চেন্ট মাশুল কাটার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ক্ষুদ্র মুদিদোকানি বা কম মার্জিনের ব্যবসায়ীদের জন্য প্রতি লেনদেনে এই মাশুল বহন করা কষ্টকর। যদিও অক্টোবর থেকে এই মাশুল উঠিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সংশ্লিষ্ট ব্যাংকাররা বলছেন, তাঁদের নিজস্ব হিসাবে টাকা জমা হলে এটিএম কার্ড দিয়েই হিসাব থেকে টাকা তুলে নিতে পারছেন বিক্রেতারা। এতে কোনো খরচ দিতে হচ্ছে না। তবে সমস্যা হচ্ছে এমএফএসের টাকা তোলার ক্ষেত্রে। সে ক্ষেত্রে নগদ টাকা উত্তোলনে ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত মাশুল দিতে হয়। তাই শুধু ব্যাংকের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক মার্চেন্ট তৈরি করলেই ক্যাশলেস সেবা জনপ্রিয় হয় না, এর জন্য সার্বিক চাহিদা তৈরি করা প্রয়োজন।

প্রতিবেশী দেশগুলোর এ–সংক্রান্ত উদ্যোগ বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুরুতে সেবাটির বহুল প্রসারে গ্রাহকদের ক্যাশব্যাক এবং বিক্রেতাদের জন্য কোনো ধরনের ফি না রাখার নীতি বা সরকারি ভর্তুকির ব্যবস্থা ছিল। ভারতে কিউআর কোড জনপ্রিয় করতে গ্রাহক থেকে শুরু করে মার্চেন্ট, ব্যাংক, এমএফএসসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে কয়েক বছর ভর্তুকি দিয়েছে দেশটির সরকার। এমনকি লেনদেনের ওপর ভিত্তিতে করে প্রতিদিন কয়েক হাজার গ্রাহককে নগদ অর্থ পুরস্কারও দেওয়া হয়। একই ধরনের পুরস্কারের ব্যবস্থা ছিল ব্যবহারকারী মার্চেন্টদের জন্যও। মার্চেন্টদের লেনদেনের খরচও মওকুফ করা হয়েছিল।

এদিকে, দেশে কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন জনপ্রিয় করার নানা চেষ্টার মধ্যেও মার্চেন্টদের হিসাব খোলার জটিলতা দূর হয়নি। আবার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য পার্সোনাল রিটেইল অ্যাকাউন্ট খোলার প্রক্রিয়াও পুরোপুরি ডিজিটাল বা পেপারলেস হয়নি। ফলে ব্যাংক ও এমএফএস কর্মকর্তাদের প্রতিষ্ঠান ঘুরে ঘুরে এসব হিসাব খুলতে হচ্ছে। ফলে অনেক আগ্রহী বিক্রেতা সেবাটি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ ছাড়া অনেক ব্যাংকের অ্যাপস এখনো পুরোপুরি বাংলা কিউআরের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়নি।

এ ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সেবা মাশুল গ্রহণে বাংলা কিউআর ব্যবহারের নির্দেশনা নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি সেবা গ্রহণে বাংলা কিউআর কোড ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হলে তাতে এই সেবা ব্যবহারে বড় চাহিদা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে এই ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে এই নির্দেশনা সরকারের সদিচ্ছারও প্রকাশ ঘটাবে। পাশাপাশি সরকারি সেবায় দুর্নীতি কমবে।

আরও পড়ুন

কী করা দরকার

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরীর মতে, দুর্নীতি রোধ ও ডিজিটাল লেনদেন প্রসারে বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়াতে হবে। তবে এ জন্য অন্য দেশের সফল মডেল অনুসরণ করা জরুরি। ছোট ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল লেনদেনের ওপর নির্ভর করে হয়রানি করা যাবে না। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সেবায় লেনদেনে কোড ব্যবহারে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সব মিলিয়ে চাহিদা তৈরি করতে হবে, পাশাপাশি জোগানও সমভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। তাহলে এই সেবা জনপ্রিয় হবে।

ব্যাংকাররা বলছেন, কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ব্যবসায়ীদের জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করা না গেলে বাংলা কিউআর কেবল একটি বাধ্যবাধকতা সেবা হিসেবে থেকে যাবে। মূলধারার অর্থনীতিকে ক্যাশলেসে রূপান্তর করতে সক্ষম হবে না। এ জন্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের টার্নওভার করের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দিয়ে এনবিআরের সঙ্গে সহজ কর কাঠামোর সমন্বয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে অঞ্চল বা খাতভিত্তিক মার্চেন্ট হিসাব তৈরির দায়িত্ব দিতে হবে। এতে একজন বিক্রেতার কাছে একাধিক ব্যাংক ও এমএফএস যাওয়ার প্রবণতা কমবে। এ ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারিতে বাংলা কিউআরে লেনদেন হয়েছিল ২১২ কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২১৮ কোটি ও মার্চে ২২৯ কোটি টাকা। এপ্রিলে লেনদেন হয় ১৯৯ কোটি টাকা, মে মাসে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪৭৯ কোটি টাকা। জুন মাসে বড় প্রচারণা শুরুর পর কিউআর কোডে লেনদেন বেড়ে হয় ৮৪৪ কোটি টাকা। জুলাইয়ে তা আরও বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা হয়েছে। ব্যাংক ও এমএফএসগুলো নিজস্ব কিউআর কোডকে বাংলা কিউআরে রূপান্তর করায় প্রায় ১৭ লাখ বাংলা কিউআর দিয়ে উদ্যোগটি শুরু হয়। চলতি মাসের প্রথম ১৫ দিনে আরও ৩ লাখের বেশি বাংলা কিউআর চালু করেছে ব্যাংক ও এমএফএসগুলো।