স্বল্প সময়ে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবায় প্রবৃদ্ধির কথা বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা বলা, এই সেবা বিকাশের অন্যতম কারণ হলো, এটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও ব্যয়সাশ্রয়ী সেবা। এজেন্ট আউটলেটে একজন গ্রাহক সহজেই তাঁর বায়োমেট্রিক বা হাতের আঙুলের স্পর্শের মাধ্যমে হিসাব পরিচালনা করতে পারেন। তাই গ্রামীণ জনপদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যকরী একটি উদ্যোগ বলে বিবেচিত হচ্ছে। এ জন্য ব্যাংকগুলোও তাদের এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম প্রতিনিয়ত বাড়াচ্ছে।

জানা যায়, বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ব্রাজিলে প্রথম এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু হয়। আর বাংলাদেশে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে প্রথম এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করে ব্যাংক এশিয়া। তারা পরীক্ষামূলকভাবে মুন্সিগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলায় এই কার্যক্রম শুরু করে। ওই উপজেলার জৈনসার ইউনিয়নের ব্যবসায়ী ইসলাম শেখকে প্রথম এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ করে ব্যাংকটি।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনাসংক্রান্ত নীতিমালা জারি করে। সেই নীতিমালা অনুযায়ী, এজেন্ট ব্যাংকিং পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সঙ্গে প্রত্যেক এজেন্টের একটি চলতি হিসাব থাকতে হয়। এ সেবার মাধ্যমে ছোট অঙ্কের অর্থ জমা ও উত্তোলন করা যায়।

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স স্থানীয় মুদ্রায় বিতরণ, ছোট অঙ্কের ঋণ প্রদান ও আদায় এবং এককালীন জমার কাজও করেন এজেন্টরা। তাঁদের মাধ্যমে বিভিন্ন উপযোগ সেবার বিল পরিশোধের পাশাপাশি সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর অর্থও উত্তোলন করা যায়। এ ছাড়া নীতিমালা অনুযায়ী ব্যাংক হিসাব খোলা, ঋণ আবেদন, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের নথিপত্র সংগ্রহ করতে পারেন এসব এজেন্ট। তবে এখনো বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের কোনো সুযোগ নেই এজেন্টদের।

বিশেষ করে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ যখন শুরু হয়, তখন তীব্রভাবে এই সেবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। যেমন ২০২০ সালের মার্চ-এপ্রিলে ব্যাংকের শাখা বন্ধ থাকার সময় সব এজেন্ট খোলা ছিল। এতে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ওপর মানুষের আস্থা আরও বৃদ্ধি পায়। ফলে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবায় ভালো প্রবৃদ্ধি হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বরের শেষে এজেন্টের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ হাজার ৫৬। প্রত্যেক এজেন্টের অবশ্য একাধিক আউটলেট রাখার সুযোগ রয়েছে। নভেম্বরের শেষে আউটলেট বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার ৬২১টি। এর মধ্যে গ্রামে আউটলেট ১৭ হাজার ৭৭৮ ও শহরে ২ হাজার ৮৪৩টি।

 গত নভেম্বরে এই সেবার গ্রাহক বেড়ে হয়েছে ১ কোটি ৭২ লাখ ৫১ হাজার। ২০২১ সালের নভেম্বরে গ্রাহক ছিলেন ১ কোটি ৩৫ লাখ ৭ হাজার। এক বছরে গ্রাহক বেড়েছে প্রায় ৩৭ লাখ। আর ২০২০ সালের মার্চে গ্রাহক ছিলেন ৬৪ লাখ ৮৫ হাজার। অর্থাৎ করোনা শুরুর পর গ্রাহক বেড়েছে ১ লাখ ৮ হাজার। তার মানে ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালে যত গ্রাহক পেয়েছে, তার চেয়ে বেশি গ্রাহক পেয়েছে গত তিন বছরে।

ব্যাংকাররা বলেন, কেউ বাসার পাশে সেবা পাওয়ায়, আবার কেউবা সঞ্চয়ের জন্য এজেন্ট ব্যাংকিং হিসাব খুলেছেন। করোনাকালে ব্যাংকগুলোর অনেক শাখা খোলা না থাকলেও এজেন্ট ব্যাংকিং ঠিকই খোলা ছিল। এ কারণে এই সেবার প্রতি মানুষের আস্থা বেড়েছে। ফলে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আমানত রাখার পাশাপাশি ঋণ বিতরণ ও প্রবাসী আয় তথা রেমিট্যান্স আনার পরিমাণও বেড়েছে।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে গত নভেম্বরে আমানত বেড়ে হয়েছে ২৯ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা, যা ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৭ হাজার ৫৪৩ কোটি টাকা। তিন বছরে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবায় আমানত বেড়েছে ৩০০ শতাংশের বেশি।

এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা সম্পর্কে এনআরবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুন মাহমুদ শাহ বলেন, ‘আমাদের এজেন্টরা ভালো সাড়া পাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকেরাও কোন ব্যাংকে সেবা নিচ্ছে, এটা মুখ্য না। হাতের কাছে সেবা পাচ্ছে, এটাই বড় বিষয়। এর ফলে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা অল্প সময়ে বড় গ্রাহক ধরতে পেরেছে।’

ব্যাংকগুলো এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা ইউনিয়ন সেন্টারে নিয়ে গেছে। গ্রাহকের আমানত রাখা, গ্রাহকদের মধ্যে ঋণ বিতরণ ও আদায় এবং প্রবাসী আয় আনার পাশাপাশি স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম ও গ্রামগঞ্জে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ভাতা বিতরণ করছেন এজেন্টরা।