বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ব্যাংকের ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। তাতে আমানতের সুদহারও কমে যায়। তবে ব্যাংকটি ২০১৮ সাল থেকেই আমানতের সুদ কমাতে উদ্যোগ নেয়। এ জন্য উচ্চ সুদের আমানত ছেড়ে দিয়ে কম সুদের আমানতে নজর দেয়, যা ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি মজবুত করেছে।

আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ব্যাংকটির আমানত ছিল ১৭ হাজার ৪২১ কোটি টাকা, যা গত ৩১ আগস্ট বেড়ে হয়েছে ২২ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা। আর ২০১৮ সালে ঋণ ছিল ১৮ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা, যা গত ৩১ আগস্ট শেষে বেড়ে হয়েছে ২৩ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের জুনে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ৭৯২ কোটি টাকা, সর্বশেষ গত জুন শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯৬২ কেটি টাকায়।

দেশের বিভিন্ন ব্যাংককে অনেকে কোনো গ্রুপের বা ব্যক্তির ব্যাংক বলে পরিচয় করিয়ে দেয়। তবে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের এমন কোনো পরিচয় নেই
শহীদুল ইসলাম, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক

জানা গেছে, ২০১৮ সালের জুন মাসে ব্যাংকটির আমানতের ৬৬ শতাংশই ছিল বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের, এসব আমানতের সুদ ছিল বেশি। গত জুন শেষে উচ্চ সুদের আমানত কমে হয়েছে ৫৫ শতাংশে। আর একই সময়ের ব্যবধানে ব্যাংকটিতে কম সুদের আমানত ১৭ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ২১ শতাংশ। আর বিনা সুদের আমানত ১৭ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে প্রায় ২৪ শতাংশ। ব্যাংকটিতে গত চার বছরে যুক্ত হয়েছে চার লাখ নতুন বেমেয়াদি চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব (কাসা হিসাব)।

তাতে গত জুন শেষে এ ধরনের হিসাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৪৪ হাজার। অথচ ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠার পর ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকটিতে এ ধরনের হিসাব ছিল মাত্র ৪ লাখ ৪৫ হাজার। ২০১৮ সালের জুনে ব্যাংকটির তহবিল খরচ ছিল ৮ দশমিক ২৩ শতাংশ, গত জুনে তা কমে হয়েছে ৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের বিদায়ী এমডি শহীদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ব্যাংকটিতে যোগ দিয়ে সব কর্মীকে কম সুদের আমানত সংগ্রহের লক্ষ্য বেঁধে দিয়েছিলাম। এর ফলে সব কর্মী চাঙা হয়, যা ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি মজবুত করতে সহায়তা করে। এ উদ্যোগের সুফল ব্যাংকটি ধীরে ধীরে পেতে শুরু করেছে।’

শহীদুল ইসলাম আরও বলেন, ‘আমার দায়িত্বকালে ব্যাংকের কোনো কর্মীকে বরখাস্ত বা ব্যাংক ছাড়তে বাধ্য করা হয়নি। কোনো বড় গ্রুপকে নতুন করে ঋণও দেওয়া হয়নি। ছোট ছোট ঋণ দিয়ে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি মজবুত করেছি। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে জোর দিয়েছি, যা ব্যাংকটির আয় বাড়াতে সহায়তা করেছে।’

আর্থিক বিবরণীর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ব্যাংকটির আমদানি বাণিজ্য ছিল ১৪ হাজার ২৬ কোটি টাকা, ২০২১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৪ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকায়। আর চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত আমদানি বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ২১০ কোটি টাকায়। ২০১৮ সালে ব্যাংকটির রপ্তানি বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৫২৭ কোটি টাকার, ২০২১ সালে যা বেড়ে হয় ১৯ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। আর গত আগস্ট পর্যন্ত রপ্তানি বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ১৩৯ কোটি টাকায়।
আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে অর্থায়ন বৃদ্ধির ফলে গত আগস্টে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা বেড়ে হয়েছে ৬৫৪ কোটি টাকা। ২০২১ সালের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে পরিচালন মুনাফা ছিল ৩৮৮ কোটি টাকা।

শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘ঋণ নিয়মিত আদায় হচ্ছে, এমন কোনো গ্রাহকের সুদ ব্যাংকের আয়ে নেওয়া হয়নি। তার ওপর প্রায় ১৫০ কোটি টাকা অতিরিক্ত নিরাপত্তা সঞ্চিতি রেখেছি। দেশের বিভিন্ন ব্যাংককে অনেকে কোনো গ্রুপের বা ব্যক্তির ব্যাংক বলে পরিচয় করিয়ে দেয়, কিন্তু শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের এমন কোনো পরিচয় নেই, যা ব্যাংকটিকে শক্ত অবস্থানে নিতে সহায়তা করেছে।’

বেসরকারি এই ব্যাংকটির সারা দেশে শাখা আছে ১৩২টি শাখা। জনবল রয়েছে ২ হাজার ৭৫৬ জন। ২০১৮ সালে কর্মী প্রতি মুনাফা ছিল দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ, যা গত জুনে বেড়ে হয়েছে শূন্য দশমিক ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ গত চার বছরে ব্যাংকটির কর্মীপ্রতি মুনাফা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে।