যে কারণে ইসলামী ব্যাংকের মুনাফা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে গেল
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বড় ধাক্কা লেগেছে ইসলামী ব্যাংকের মুনাফায়। গত জানুয়ারি থেকে জুন—এই ছয় মাসে ব্যাংকটি মুনাফা করেছে ৬৭ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ৩৫৭ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটির মুনাফা ২৯০ কোটি টাকা বা ৮১ শতাংশ কমেছে। ব্যাংকটির অর্ধবার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের মুনাফা কমে যাওয়ার প্রধান কারণ বিনিয়োগের আয় বা সুদের চেয়ে আমানতের ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে যাওয়া। অথচ এই ছয় মাসে ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ আয় আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৫২ কোটি টাকা বা প্রায় সোয়া ৪ শতাংশ বেড়েছে। গত জানুয়ারি থেকে জুন—এই ছয় মাসে ব্যাংকটি ঋণ বা বিনিয়োগের সুদ বাবদ আয় করেছে ৬ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা। আর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আমানতের সুদ বাবদ ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে আমানতের সুদ বাবদ ব্যয় বেড়েছে ১ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা বা ৩৪ শতাংশ। সুদ আয়ের চেয়ে সুদ ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকটির মুনাফায়ও বড় ধরনের ধাক্কা লাগে।
গত বছরের আগস্টে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় এস আলম মুক্ত হয়। ২০১৭ সালে শেয়ারবাজার থেকে নামে-বেনামে শেয়ার কিনে ব্যাংকটি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপ। এরপর ব্যাংকটিতে বড় ধরনের ঋণ অনিয়মের ঘটনা ঘটে। নামে-বেনামে এস আলম ও তার সুবিধাভোগীরা ব্যাংকটি থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ বের করে নেয়। গত বছরের আগস্ট-পরবর্তী রদবদলে এসব ঋণের বড় অংশই এখন খেলাপি। এসব ঋণ ও ঋণের সুদ কোনোটাই আদায় হচ্ছে না। ফলে বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়ে ব্যাংকটি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ ও তদারকিতে ব্যাংকটি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। ব্যাংকটি যাতে ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সে জন্য এস আলমের বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশনিংয়ে ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ কারণে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে খেলাপি ঋণবাবদ খুব বেশি অর্থ প্রভিশন করতে হয়নি। তাতে কিছু মুনাফা হয়েছে ব্যাংকটির।
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইসলামী ব্যাংক প্রভিশনিং বাবদ বরাদ্দ রেখেছে ৭০ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ৩৭৭ কোটি টাকা। সেই হিসাবে প্রভিশনিং বাবদ ব্যয় কমেছে ৩০৭ কোটি টাকা। তবু ব্যাংকটির মুনাফা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে শুধু সুদ আয়ের চেয়ে সুদ ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায়।
ব্যাংকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সুদহার বাজারভিত্তিক করে দেওয়ার বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তের ফলে আমানতের সুদহার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে গত এক বছরে। তাতে এই খাতে ব্যাংকটির খরচও বেড়ে গেছে। আবার গত বছরের আগস্টে পরিবর্তনের পর ব্যাংকটির পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন হয়। এরপর ব্যাংকটি তারল্যসংকট কাটাতে আমানত সংগ্রহে বেশি মনোযোগ দেয়। এ সময় আমানত বেড়েছে ব্যাংকটির। ফলে এ বাবদ খরচও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে গেছে। গত এক বছরে ইসলামী ব্যাংক নতুন করে ২৩ হাজার কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করেছে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিজ্ঞাপনে জানিয়েছে ব্যাংকটি। তাতে ব্যাংকটির মোট আমানত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা। বিপুল এই আমানতের জন্য ব্যাংকটিকে মাসে মাসে বিপুল সুদও দিতে হচ্ছে। যার ধাক্কা এসে লাগছে মুনাফায়।