ইসলামী ব্যাংকে এস আলমের এক রহস্যময় সফর

কড়া নিরাপত্তা। ছবি তোলা যাবে না। সব সিসিটিভি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারপর তিনি এলেন দুপুরের কিছু আগে। এটি সেই এক দিনের সফরেরই কাহিনি।

দুপুর ১২টা ৩১ মিনিটে আহসানুল আলমকে চেয়ারম্যানের চেয়ারে বসিয়ে দেন এস আলমছবি সংগৃহীত

ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সেদিন সকাল থেকেই অস্বাভাবিক এক নীরবতা। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের আগের দিনই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে সকাল সাড়ে নয়টার মধ্যে দাপ্তরিক পোশাকে উপস্থিত থাকতে হবে, কেউ ছবি তুলতে পারবেন না। একে একে বন্ধ করে দেওয়া হয় সিসিটিভি ক্যামেরা। নিরাপত্তা বাড়ানো হয় কয়েক গুণ। ব্যাংকের ভেতরে গুঞ্জন ছিল, আসছেন ‘তিনি’।

দুপুর গড়ানোর কিছু আগে কালো গাড়ির বহর এসে থামে মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংকের সদর দপ্তরের সামনে। গাড়ি থেকে নামেন তিনি। সঙ্গে দুই ছেলে, জামাতা ও ঘনিষ্ঠ সহকারীরা। ২০১৭ সালে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর এ ছিল ইসলামী ব্যাংকে তাঁর বিরল উপস্থিতিগুলোর একটি।

আরও পড়ুন

অবশেষে ছেলে হলেন চেয়ারম্যান

২০১৭ সালে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সহায়তায় ইসলামী ব্যাংক দখল করে চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপ। দখলের দিন সাবেক সচিব আরাস্তু খানকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এস আলমের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে তিনি দেড় বছরের মাথায় পদত্যাগ করলে ২০১৮ সালের এপ্রিলে নতুন চেয়ারম্যান করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অনারারি অধ্যাপক নাজমুল হাসানকে। এই সময়ে ব্যাংকটিতে ব্যাপক ঋণ অনিয়ম, পরীক্ষা ছাড়া নিয়োগ, অর্থ পাচারসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ২০২৩ সালের ১৮ জুন নাজমুল হাসানকে সরিয়ে নতুন চেয়ারম্যান করা হয় আহসানুল আলমকে, তিনি এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের ছেলে। তখন তিনি ছিলেন ব্যাংক খাতের সর্বকনিষ্ঠ চেয়ারম্যান। বয়স তখন ৩০ বছরের নিচে ছিল। চেয়ারম্যান হওয়ার পর অনলাইনে দুটি সভায় অংশ নেন আহসানুল আলম।

কেক কেটে চেয়ারম্যানের আগমন উদযাপন করেন ব্যাংকের পরিচালক ও কর্মকর্তারা।
আরও পড়ুন

রহস্যময় সেই সফর

২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংক দখল করলেও ব্যাংকটিতে যেতেন না এস আলম। তাঁর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিএস) আকিজ উদ্দিন ও ব্যাংকটিতে কর্মরত অনুসারীরা ব্যাংকটি পরিচালনা করতেন।

ইসলামী ব্যাংকের একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দখলের পর সব মিলিয়ে তিন দিন ব্যাংকটিতে গিয়েছিলেন এস আলম। তাঁর যাওয়ার আগে ব্যাংকের সব সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ করে দেওয়া হতো। আগে থেকে জ্যেষ্ঠ সব কর্মকর্তাকে দাপ্তরিক পোশাক পরিধানের ব্যাপারে সতর্ক করে মেইল করা হতো। পাশাপাশি নিরাপত্তা জোরদার করা হতো, যাতে কেউ ছবি তুলতে না পারে ও কারও মুখোমুখি না হতে হয়।

আরও পড়ুন

এমন একটি দিন ছিল ২০২৩ সালের ৪ জুলাই। সেদিন ছেলে আহসানুল আলমকে চেয়ারম্যান পদে বসানোর জন্য ব্যাংকে যান এস আলম। দিনটি ছিল মঙ্গলবার। সেদিন ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সভা ছিল। সশরীরের ব্যাংকটিতে প্রথম যান আহসানুল আলম। যদিও তাঁর আগে অনলাইনে দুটি সভা করেন তিনি।

এর আগে ৩ জুলাই ব্যাংকটির অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান বেলাল হোসেন এক মেইলে জ্যেষ্ঠ কর্মীদের জানান, ব্যাংকের নতুন অবকাঠামো শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবস্থাপকেরা পরিদর্শন করবেন। এ জন্য সবাইকে দাপ্তরিক পোশাক পরিধান করে ৪ জুলাই সকাল সাড়ে ৯টার মধ্যে উপস্থিত হতে বলা হয়। পাশাপাশি সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হয়,কেউ কোনো ছবি তুলতে পারবে না।

বাঁ থেকে: এস আলমের পিএস ও ইসলামী ব্যাংকের ডিএমডি আকিজ উদ্দিন, এস আলমের জামাতা ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান বেলাল আহমেদ, এস আলমের ছেলে ও ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহসানুল আলম, সাইফুল আলম বা এস আলম, ইসলামী ব্যাংকের এমডি মনিরুল মওলা, অতিরিক্ত এমডি কায়সার আলী, কোম্পানি সচিব জে কিউ এম হাবিবুল্লাহ, ডিএমডি আলতাফ হোসেন, কাজী রেজাউল করিম, মিফতা উদ্দিন, জামাল উদ্দিন মজুমদার ও কামাল উদ্দিন
ছবি সংগৃহীত

ছবি কথা বলে

কারও ছবি তোলার অনুমতি না থাকলেও এস আলম–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা একজন ক্যামেরাপারসন ঠিক করেন। তিনি ক্যানন ইয়স ৫ডি মার্ক থ্রি মডেলের একটি ক্যামেরা নিয়ে সকাল থেকে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর কিছু ছবি এসেছে প্রথম আলোর কাছে।

ছবিগুলোতে দেখা গেছে, দুপুর ১২টার কিছু পরে ব্যাংকটিতে প্রবেশ করে এস আলম। সঙ্গে ছিলেন তার দুই ছেলে আহসানুল আলম ও আশরাফুল আলম, জামাতা বেলাল আহমেদ ও ব্যক্তিগত সচিব আকিজ উদ্দিন। ব্যাংকটির তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনিরুল মাওলা, অতিরিক্ত এমডি মোহাম্মদ কায়সার আলী, জে কিউ এম হাবিবুল্লাহসহ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এস আলম, তাঁর দুই ছেলে ও জামাতাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন।

আরও পড়ুন

এরপর তাঁদের উপস্থিতিতে দুপুর ১২টা ২৬ মিনিটে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সভাকক্ষে কেক কেটে নতুন চেয়ারম্যানের যোগদান উদ্‌যাপন করেন ব্যাংকের সব পরিচালক ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। এস আলমের সঙ্গে ছবি তুলতে ও পরিচিতি হতে দেখা যায় তাঁদের। দুপুর ১২টা ৩১ মিনিটে আহসানুল আলমকে চেয়ারম্যানের চেয়ারে বসিয়ে দেন এস আলম। এ সময় সবাই হাততালি দিয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানান। দুপুর ১২টা ৩৩ মিনিটে ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগ ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রধানেরা নতুন চেয়ারম্যানকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন। এরপর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ করা প্রশাসক সরোয়ার হোসেনও এ সময় উপস্থিত ছিলেন। সভাটি সব মিলিয়ে চলে সর্বোচ্চ আধা ঘণ্টা। বেলা একটার দিকে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের এমডি জাফর আলম নতুন চেয়ারম্যানকে পৃথকভাবে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন।

আহসানুল আলমকে চেয়ারম্যানের চেয়ারে বসিয়ে দেন এস আলম

ব্যাংকটির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, সেদিন নিরাপত্তা এত বেশি জোরদার করা হয়েছিল যে অনেকে মুঠোফোন নিয়েও যেতে পারেননি। ব্যাংকটির নিজস্ব নিরাপত্তার পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। এস আলম তাঁর পরিবারসহ লিফট থেকে নামার সময় একজন উৎসুক কর্মচারী এস আলমের ছবি তুলেছিলেন। তাৎক্ষণিক তাঁকে বদলি করে ঢাকার বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

ব্যাংকটিতে এস আলমের ভ্রমণটি ছিল সবার জন্য অস্বস্তিকর। ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নিলেও অনুগত কর্মকর্তাদের দিয়ে ব্যাংকটি পরিচালনা করতেন। সব মিলিয়ে বিভিন্ন নামে ব্যাংকটি থেকে এক লাখ কোটি টাকার বেশি তুলে নেন। নিজ এলাকায় বক্স বসিয়ে প্রায় ১০ হাজার কর্মকর্তা নিয়োগ দেন। এতে ব্যাংকটির অর্ধেকের বেশি ঋণ খেলাপি হয়ে পড়ে। আর অদক্ষ জনবল নিয়ে বিপাকে আছে ব্যাংকটি। তাঁর অনিয়ম পুরো দেশের অর্থনীতিকে সংকটে ফেলেছে।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন