হাজার কোটি টাকার মুনাফার ক্লাবে এবার পূবালী ব্যাংক

দেশীয় মালিকানার ব্যাংকের মধ্যে এবার হাজার কোটি টাকার মুনাফার ক্লাবে যুক্ত হয়েছে পূবালী ব্যাংক। গত বছর শেষে ব্যাংকটির মুনাফা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯০ কোটি টাকা। এর আগে দেশীয় ব্যাংকের মধ্যে হাজার কোটি টাকার বেশি মুনাফার ক্লাবে ছিল ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক। এর মধ্যে গত বছর দেশীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে রেকর্ড ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকার মুনাফা করেছে ব্র্যাক ব্যাংক। আর সিটি ব্যাংকের মুনাফা ছিল ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। এখন হাজার কোটি টাকার মুনাফার ক্লাবে প্রথমবারের মতো যুক্ত হলো পূবালী ব্যাংকও।

গত বুধবার পূবালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় গত বছরের আর্থিক প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হয়। তাতে ব্যাংকটির রেকর্ড মুনাফার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। পূবালী ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংকটির মুনাফা এক বছরের ব্যবধানে ৩১১ কোটি টাকা বা ৪০ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৪ সালে ব্যাংকটির সমন্বিত মুনাফার পরিমাণ ছিল ৭৮০ কোটি টাকা। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি হিসেবে গতকাল বৃহস্পতিবার মুনাফার এই তথ্য বিনিয়োগকারীদের জানিয়েছে ব্যাংকটি। দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এ তথ্য বিনিয়োগকারীদের জানানো হয়।

রেকর্ড মুনাফার তথ্য চূড়ান্ত করার পাশাপাশি বুধবারের একই সভা থেকে গত বছর শেষে শেয়ারধারীদের জন্য লভ্যাংশের ঘোষণাও দেওয়া হয়। গত বছরের জন্য ব্যাংকটি মোট ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। যার মধ্যে ১৫ শতাংশ নগদ ও ১৫ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ। ২০২৪ সালে ব্যাংকটি শেয়ারধারীদের সাড়ে ১২ শতাংশ নগদ ও সাড়ে ১২ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছিল। সেই হিসাবে আগের বছরের চেয়ে গত বছর লভ্যাংশের পরিমাণ ৫ শতাংশ বেড়েছে। গত বছরের জন্য ঘোষিত লভ্যাংশ অনুযায়ী, শেয়ারধারীরা প্রতি ১০০ শেয়ারের বিপরীতে ১৫০ টাকা নগদ ও ১৫টি বোনাস শেয়ার পাবেন।

বাজারে আমাদের যত ঋণ বা সম্পদ রয়েছে, তার বিপরীতে কমবেশি আয় যুক্ত হয়েছে ব্যাংকের হিসাবের খাতায়। এ কারণে বছর শেষে আমরা প্রথমবারের মতো হাজার কোটি টাকার মুনাফার ক্লাবে যুক্ত হতে পেরেছি
মোহাম্মদ আলী, এমডি, পূবালী ব্যাংক

পূবালী ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর পূবালী ব্যাংক ঋণের সুদবাবদ আয় করেছে ৬ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে যার পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে সুদবাবদ ব্যাংকটির আয় বেড়েছে ৮৫২ কোটি টাকা বা সাড়ে ১৪ শতাংশের বেশি। ঋণের সুদবাবদ আয়ের বিপরীতে গত বছর আমানতের সুদবাবদ ব্যাংকটির খরচ হয় ৫ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে এ খাতের ব্যাংকটির খরচের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে ব্যাংকটির আমানতের সুদবাবদ খরচ এক বছরের ব্যবধানে ১ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা বা প্রায় ৩৩ শতাংশ বেড়েছে। গত বছর আমানতের সুদ বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। এ কারণে আমানতের সুদবাবদ ব্যয়ও বেড়ে গেছে।

ঋণের সুদ আয়ের চেয়ে আমানতের সুদ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় গত বছর শেষে ব্যাংকটির প্রকৃত সুদ আয় আগের বছরের চেয়ে কিছুটা কমেছে। গত বছর শেষে ব্যাংকটির প্রকৃত সুদ আয় দাঁড়িয়েছে ৯৫৩ কোটি টাকায়। ২০২৪ সালে যার পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা। সেই হিসাবে ২০২৪ সালের চেয়ে ২০২৫ সালে এসে ব্যাংকটির প্রকৃত সুদ আয় ৫৬১ কোটি টাকা কমে গেছে। তা সত্ত্বেও ব্যাংকটি প্রথমবারের মতো হাজার কোটি টাকার মুনাফার ক্লাবে জায়গা করে নিয়েছে। কারণ, বিনিয়োগ, কমিশনসহ অন্যান্য খাত থেকে ব্যাংকটির আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে।

আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর পূবালী ব্যাংক সরকারি বিল, বন্ডের বিনিয়োগ থেকে আয় করেছে ৩ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা। আগের বছর এই খাত থেকে ব্যাংকটির আয় ছিল ২ হাজার ৬২ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে বিনিয়োগ থেকে পূবালী ব্যাংকের আয় বেড়েছে ১ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা বা প্রায় ৭২ শতাংশ। এ ছাড়া বেড়েছে কমিশন, ব্রোকারেজ আয়সহ অন্যান্য আয়ও। তাতে গত বছরের পরিচালন মুনাফা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে যার পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা। পরিচালন মুনাফা থেকে পরিচালন ও করবাবদ খরচ এবং খেলাপি ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশনিংয়ের পর ব্যাংকটির প্রকৃত মুনাফা দাঁড়ায় ১ হাজার ৯০ কোটি টাকা।

আর্থিক সাফল্য ও রেকর্ড মুনাফার বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের ব্যাংকের প্রধান শক্তি সুশাসন। এ ছাড়া আমাদের ব্যাংকের মন্দ ঋণের পরিমাণ ২ দশমিক ২ শতাংশ। ফলে বাজারে আমাদের যত ঋণ বা সম্পদ রয়েছে, তার বিপরীতে কমবেশি আয় যুক্ত হয়েছে ব্যাংকের হিসাবের খাতায়। অর্থাৎ আমাদের ব্যাংকের বেশির ভাগ সম্পদই আয়যোগ্য। এ কারণে বছর শেষে আমরা প্রথমবারের মতো হাজার কোটি টাকার মুনাফার ক্লাবে যুক্ত হতে পেরেছি।’

মোহাম্মদ আলী আরও বলেন, ‘আমাদের ব্যাংকের আয়ের বড় অংশ আসে এখনো সুদ আয় থেকে। গত বছর আমাদের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা। আর সরকারি বিভিন্ন বিল-বন্ডে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৩০ হাজার কোটি টাকার মতো। তাই বিনিয়োগ আয়ের চেয়ে সুদ আয়ই এখনো আমাদের মূল ভিত্তি।’