ঘরে বসে ক্লিকেই ঋণ আবেদন, জামানত ছাড়া মিলবে টাকা
ছোট অঙ্কের ঋণের জন্য এখন আর ব্যাংকের শাখায় গিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা কিংবা কোনো আত্মীয়–পরিচিতজনের কাছে ধরনা দেওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে না। হাতে একটা স্মার্টফোন, আর তাতে ইন্টারনেটের কল্যাণে কয়েক মিনিটেই পাওয়া যায় জামানতবিহীন ডিজিটাল ক্ষুদ্রঋণ। ফলে দিনে দিনে এ ঋণ সাধারণ মানুষের জন্য জরুরি প্রয়োজনে একধরনের ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে।
দেশে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে বেসরকারি সিটি ব্যাংক ও বিকাশের যৌথ উদ্যোগে তাৎক্ষণিক ডিজিটাল ক্ষুদ্রঋণের যাত্রা শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে এই সেবায় আগ্রহ বেড়েছে। বর্তমানে সিটি ব্যাংকের পাশাপাশি ব্র্যাক ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও ঢাকা ব্যাংক এ ক্ষেত্রে বেশ সক্রিয়। ব্যাংক এশিয়া আর মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকও (এমটিবি) পরীক্ষামূলক ধাপ পেরিয়ে এখন বাণিজ্যিকভাবে এই সেবা চালুর অপেক্ষায় রয়েছে।
যেভাবে পাওয়া যায় ঋণ
নতুন এই ঋণসেবা মূলত একটি ডিজিটাল ওয়ালেট ও মোবাইল অ্যাপভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা। এর জন্য গ্রাহককে সশরীর ব্যাংকে যেতে হয় না। কাগজপত্রের ঝামেলা কিংবা দীর্ঘ যাচাই-বাছাই ছাড়াই পাওয়া যায় ঋণ। এ জন্য কোনো জামানত বা জামিনদারও লাগে না।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় ব্যাংকগুলোর জন্যও এসব ঋণ তদারকি সহজ হচ্ছে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্রঋণের ডিজিটাল রূপান্তর সাধারণ মানুষকে মহাজনি ঋণের ফাঁদ থেকে দূরে রাখছে। তবে এখনো অধিকাংশ ব্যাংক অ্যাকাউন্টহোল্ডার তথা হিসাবধারীদের এবং তাঁদের মাধ্যমে যাঁদের বেতন দেওয়া হয়, সেই গ্রাহকদের এই সেবা দেয়। সিটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে অবশ্য বিকাশের সক্রিয় গ্রাহকেরা এই ঋণ পান।
যারা সেবাটি দিচ্ছে
বর্তমানে সিটি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক ডিজিটাল ক্ষুদ্রঋণ দিচ্ছে। ঋণের সীমা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত। অ্যাপের মাধ্যমে ঋণের টাকা গ্রাহকের হিসাবে জমা হয় এবং কিস্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাব থেকে কেটে নেওয়া হয়।
জরুরি প্রয়োজনে বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে সিটি ব্যাংক থেকে জামানতবিহীন ডিজিটাল অতি ক্ষুদ্রঋণ নিতে পারছেন গ্রাহকেরা। সেবাটি চালুর মাত্র তিন বছরের মধ্যেই বিকাশের মাধ্যমে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি ডিজিটাল ঋণ বিতরণ হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১৯ লাখের বেশি গ্রাহক এই ঋণ নিয়েছেন।
এ নিয়ে বিকাশের হেড অব করপোরেট কমিউনিকেশনস শামসুদ্দিন হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও জরুরি অর্থের প্রয়োজনে থাকা মানুষের কাছে এই ঋণ বিশেষ ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে।
ঢাকা ব্যাংকে হিসাব রয়েছে—এমন যেকোনো গ্রাহক মোবাইল অ্যাপ ‘ঢাকা ব্যাংক গো প্লাস’-এর মাধ্যমে ই-ঋণ তথা অতি ক্ষুদ্রঋণের জন্য আবেদন করতে পারেন। এখন পর্যন্ত ব্যাংকটির প্রায় ৩৫ হাজার গ্রাহক মোট ৮৫ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন।
ঢাকা ব্যাংকের রিটেইল ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান এইচ এম মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে জানান, তাঁদের এই ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ, যা তুলনামূলকভাবে কম। জামানত বা কাগজপত্র ছাড়াই দ্রুত ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করা হয়।
প্রাইম ব্যাংক চালু করেছে ‘প্রাইম অগ্রিম’ নামে ডিজিটাল ঋণসেবা। যাঁদের বেতন এই ব্যাংকের মাধ্যমে দেওয়া হয়, তাঁরা প্রাইম অগ্রিম অ্যাপ ব্যবহার করে ঋণ পাচ্ছেন। এ পর্যন্ত ৫০ হাজার গ্রাহক প্রায় ৫০ কোটি টাকার ডিজিটাল ঋণ নিয়েছেন ব্যাংকটি থেকে। মোট ৭৫ হাজারবার ঋণ দেওয়া হয়েছে।
প্রাইম ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজিম এ চৌধুরী বলেন, গ্রাহকেরা সহজে ও নিশ্চিন্তে এই সেবা ব্যবহার করতে পারছেন। চলতি বছরে সব গ্রাহকের জন্য ডিজিটাল ঋণসুবিধা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে প্রাইম ব্যাংকের।
এদিকে ব্র্যাক ব্যাংকও তাদের মাধ্যমে যাঁদের বেতন হয়, সেসব গ্রাহককে তাৎক্ষণিক ডিজিটাল ঋণ দিচ্ছে। ইতিমধ্যে ৫৮ হাজার গ্রাহক মোট ৯৬০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। আগে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিলেও এখন তা বাড়িয়ে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত করা হয়েছে।
ব্র্যাক ব্যাংকের ডিএমডি মাহীয়ুল ইসলাম বলেন, এসব ঋণে খেলাপির হার কম। মূলত জীবনধারণের ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতেই মানুষ এই ঋণ নিচ্ছেন।
আসছে আরও ব্যাংক
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি) ও ব্যাংক এশিয়া বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে তাৎক্ষণিক ডিজিটাল ঋণ দিচ্ছে। ব্যাংক দুটি সামনে বড় পরিসরে এই সেবা চালুর পরিকল্পনা করছে।
জানতে চাইলে ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সোহেল আর কে হুসেইন প্রথম আলোকে বলেন, এমএফএস ও মুঠোফোন অপারেটরদের ডেটা ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে এই সেবা চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।