সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অর্থসচিব ফাতিমা ইয়াসমিন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শরিফা খান, বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের কান্ট্রি ডিরেক্টর আবদুলায়ে সেক, আঞ্চলিক ডিরেক্টর গুয়াংজে চেন এবং ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ড্যানড্যান চেন উপস্থিত ছিলেন।

মার্টিন রেইজার ও আবদুলায়ে সেক তিন দিনের সফরে গত শনিবার ঢাকায় আসেন। সফরকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ২০২৩-২৫ সময়ে ৬১৫ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ পাওয়ার কথা রয়েছে বাংলাদেশের। অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, ঋণ প্রস্তাবগুলো এখন পাইপলাইনে। তবে কোভিড-১৯ এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে উদ্ভূত বিরূপ পরিস্থিতি থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের জন্য আরও সহায়তা চাওয়া হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশ ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে বিশ্বব্যাংক থেকে ১০০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা পেয়েছে। আগামী দুই অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের গ্রিন, রেসিলিয়েন্স, ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্ট (জিআরআইডি) নামের কর্মসূচি থেকে ২৫ কোটি ডলার করে মোট ৫০ কোটি ডলার পাওয়া যাবে বলেও আশাবাদী তিনি।

এদিকে এই জিআরআইডির বাইরে এ অর্থবছরে ২৫ কোটি ডলার আশা করা হচ্ছে বিশ্বব্যাংকের ডেভেলপমেন্ট পলিসি ক্রেডিটের (ডিপিসি) আওতায় দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ হিসেবে। গত অর্থবছরে প্রথম কিস্তির ২৫ কোটি ডলার পাওয়া গেছে।

সূত্র জানায়, বাজেট সহায়তার অর্থ পাঁচ বছরের রেয়াতকালসহ ৩০ বছরে ২ শতাংশ সুদসহ পরিশোধ করতে হবে। তবে বাজেট সহায়তার অর্থ পেতে কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনসহ কিছু শর্ত পূরণ হলে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই ডিপিসির দ্বিতীয় কিস্তির ২৫ কোটি ডলার পাওয়া যাবে বলে জানা গেছে।

বৈঠকে বিশ্বব্যাংককে বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে অভিহিত করেন অর্থমন্ত্রী। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অর্থমন্ত্রী বলেছেন, উন্নয়ন কার্যক্রমে বিশ্বব্যাংক থেকে এযাবৎ ৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলার ঋণ ও অনুদান সহায়তা পেয়েছে বাংলাদেশ। আর সুদ ও আসল মিলে পরিশোধ করা হয়েছে ৬৩৬ কোটি ডলার।

বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে অর্থমন্ত্রী কথা বলেন শুধু ‘বিউটিফিকেশন অব ঢাকা’ নামের একটি প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ঋণ দেওয়া নিয়ে। অর্থমন্ত্রী জানান, ঢাকার চারপাশের নদীগুলো দখলমুক্ত করে রাজধানীকে বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলার কাজে এ ঋণের অর্থ ব্যবহৃত হবে। সমীক্ষা শেষ হয়েছে। এ প্রকল্পে ঋণ দিতে রাজি হয়েছে বিশ্বব্যাংক।

এদিকে ইআরডি সচিব শরিফা খানের সঙ্গে গতকাল বৈঠক করেন মার্টিন রেইজার। দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে পাইপলাইনে থাকা প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার দ্রুত ছাড়ের বিষয়েও আলোচনা হয়। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব অর্থনীতিতে কতটা পড়েছে, তা–ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় উঠে আসে।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ নয়টি পণ্য আমদানি করতে ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে সম্ভাব্য ৮২০ কোটি ডলার অতিরিক্ত খরচ হয়েছে। এমন ধরনের বাড়তি ব্যয় মেটাতে বিশ্বব্যাংকের কাছে সহায়তা চাওয়া হয়েছে।

বাড়তি আমদানি ব্যয়ের কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমছে। সরকার এখন বিভিন্ন উৎস থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ নিতে চাইছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ৪৫০ কোটি ডলার।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, পাইপলাইনে থাকলেই যে ঋণ পাওয়া যাবে, এমন কোনো কথা নেই। আবার পাইপলাইনে আসতে গেলে হয় প্রকল্প সহায়তা, নয় বাজেট সহায়তা—কিছু একটার আওতায় থাকতে হয়।

কিছু পলিসি ম্যাট্রিক্স (শর্ত পূরণের বিষয়) থাকে, তাও পূরণ করতে হয়। তিনি বলেন, জিআরআইডি থেকে ২৫ কোটি ডলারের একটা কিস্তি আপাতত পাওয়া যাবে বলে মনে হয়। কম হলেও লেনদেনের ভারসাম্যের ঘাটতি পূরণে এটা সহায়ক হবে।