নারী গ্রাহকের আমানত রাখা ও ঋণ নেওয়া কমেছে, এ প্রবণতা কী বার্তা দিচ্ছে
নারীদের ব্যাংকিং–সুবিধায় আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে সুফলও এসেছে। কিন্তু হঠাৎ সেই অগ্রগ্রতির পথে টান পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে, আমানত রাখা ও ঋণ নেওয়া—উভয় ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের হার কমেছে। এতে নারীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর উদ্যোগে দুশ্চিন্তা বেড়েছে।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে গত এক–দেড় দশকে নানা উদ্যোগের ফলে দেশে ব্যাংকিং সেবা গ্রহণে নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। বাড়ির পাশে এজেন্ট ব্যাংকিং, ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণ এবং সহজে ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি নিজের একটি ব্যাংক হিসাব থাকা প্রয়োজন—এমন মানসিকতাও বেশ কাজে দিয়েছে।
সরকারের নানা উদ্যোগে ব্যাংক আমানতে নারীদের অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছিল। কিন্তু গত মার্চে আমানত ও ঋণ—উভয় দিক থেকেই নারীদের অংশগ্রহণের হার কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা ও গৃহিণী মাহফুজা আক্তার। সংসার খরচ থেকে কিছু টাকা ব্যাংকে জমা রাখতেন। সম্প্রতি ছেলেকে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় ওই টাকা তুলে ফেলেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘জরুরি প্রয়োজনের জন্য ব্যাংকে কিছু টাকা রেখেছিলাম। এখন ছেলের ভর্তির সময় কাজে লাগল। একদিকে ভালো লাগছে, অন্যদিকে খারাপও লাগছে। হাত খালি হয়ে গেল।’
মাহফুজা আক্তারের মতো এমন অনেক নারী ব্যাংকের হিসাব থেকে টাকা তুলছেন সংসারের জরুরি প্রয়োজনে। এটিও নারীদের আমানত কমানোর অন্যতম কারণ। অবশ্য অনেক নারী গ্রাহক জরুরি প্রয়োজনে টাকা দরকার হলে তা যেন পান, সেজন্য সঞ্চয় করেন।
নারী গ্রাহকের আমানত ও ঋণ পরিস্থিতি
দেশের ব্যাংকগুলোতে যে অর্থ জমা আছে, তার ৫৬ শতাংশ ব্যক্তিশ্রেণির আমানতকারীদের টাকা। অর্থাৎ, ব্যাংকে জমা টাকার বেশির ভাগই ব্যক্তিপর্যায়ের গ্রাহকদের। এই টাকার পরিমাণ ১২ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা।
চলতি বছরের মার্চের শেষে ব্যক্তি আমানত হিসাবের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৭ কোটি ১০ লাখ ৫৯ হাজার। এতে নারী হিসাব ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ। গত বছরের ডিসেম্বরে আমানত হিসাবের সংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ৬৬ লাখ ২৮ হাজার, তাতে নারী হিসাবধারীর হার ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশ। মোট ব্যাংক হিসাবে নারী গ্রাহকের অবদান কমেছে।
ব্যাংক খাতে সার্বিকভাবে আমানতের পরিমাণ বেড়েছে। ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকে ব্যক্তিশ্রেণির আমানত ছিল ১১ লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকা, যা মার্চের শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকায়। ডিসেম্বরে ব্যক্তি আমানতের মধ্যে নারীদের অংশ ছিল ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ, যা মার্চে কমে ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। এখানে নারীর আমানত রাখার হার কমেছে।
অন্যদিকে ঋণের ক্ষেত্রেও নারীদের অংশগ্রহণ কমছে। মার্চের শেষে ব্যাংকে গ্রাহকদের মোট ঋণ হিসাবের সংখ্যা বেড়ে ১ কোটি ৪১ লাখ ৬৬ হাজারে উঠেছে, যা ডিসেম্বরে ছিল ১ কোটি ৩৪ লাখ ৭৫ হাজার। মোট ঋণ হিসাবের মধ্যে নারীদের হিস্যা ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে।
এদিকে ব্যক্তিশ্রেণির আমানতকারীদের নেওয়া মোট ঋণের পরিমাণ গত ডিসেম্বরে ছিল ২ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা, যা মার্চে বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা। মোট ঋণের মধ্যে নারীদের অংশ ২০ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।
এর প্রভাব কী
বাংলাদেশে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে ব্যাংকিং খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আর্থিক সেবা, ঋণ, আর্থিক সক্ষমতা ও উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে নারীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে ব্যাংকগুলো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বর্তমানে দেশের মোট আমানতের এক-তৃতীয়াংশের বেশি নারী গ্রাহকদের কাছ থেকে এসেছে।
কিন্তু মার্চ শেষে পরিস্থিতি কিছুটা পাল্টে গেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, নারীদের আমানত কমে যাওয়ার অর্থ হলো, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং চিকিৎসা, শিক্ষাসহ বিভিন্ন জরুরি প্রয়োজনে সঞ্চয় ভেঙে পরিবারকে খরচ দিতে হচ্ছে। এর ফলে তাঁরা আপাতত ভালো থাকলেও দীর্ঘ মেয়াদে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে ঝুঁকি কমানোর জন্য অবলম্বন কমেছে। অন্যদিকে ঋণ কমে যাওয়া মানে তাঁরা নতুন করে উদ্যোগ নিচ্ছেন না।
ব্যাংকাররা কী বলছেন
ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আরফান আলীর নেতৃত্বে দেশে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বড় সম্প্রসারণ ঘটেছে, বর্তমানে তিনি জয়তুন বিজনেস সলিউশনসের চেয়ারম্যান। জানতে চাইলে আরফান আলী প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে পুরো ব্যাংক খাত চাপের মধ্যে আছে। এর প্রভাব সরাসরি প্রান্তিক পর্যায়েও পড়ছে। সেটি নারীদের ওপর অবশ্য বেশি পড়েছে। এ জন্য তাঁদের আমানত ও ঋণ কমে যেতে পারে।
তাঁর মতে, নারীদের এগিয়ে রাখতে সব সময় প্রচার–প্রচারণা, প্রণোদনা, বিশেষ তদারকিসহ নানামুখী উদ্যোগ থাকা প্রয়োজন। তাহলে ঋণে নারীদের অংশগ্রহণ আবার বাড়তে শুরু করবে।
এ নিয়ে জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, অর্থনীতির গতি মন্থর হয়ে পড়েছে। নারীরাও ঋণের জন্য ব্যাংকে আসছেন কম। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোও নারীদের ঋণ দিতে তেমন আগ্রহী নয়। অনেক ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রম তো প্রায় বন্ধ। এসব কারণে নারীদের ঋণে অংশগ্রহণ কমে গেছে।