ব্যবস্থাপনা দক্ষতায় টেকসই তালিকায় যমুনা ব্যাংক
পরিচালনা পর্ষদে একাধিক সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীর পরিবারের সদস্যরা থাকলেও যমুনা ব্যাংকের আর্থিক সূচকে তার কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। উল্টো সুফল পেয়েছে ব্যাংকটি। আওয়ামী আমলে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের ঋণের চাহিদা এড়িয়ে যেতে পেরেছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা ও পেশাদার ব্যাংকারদের কারণে ব্যাংকটির আর্থিক সূচকও ভালো অবস্থায় রয়েছে। অর্থায়নে টেকসই ধারণাকে প্রাধান্য দেওয়া ও ব্যাংক পরিচালনায় পরিবেশকে গুরুত্ব দিয়ে যাচ্ছে যমুনা ব্যাংক। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই ব্যাংকের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে ব্যাংকটি।
২০০১ সালের ৩ জুন যাত্রা শুরু করা যমুনা ব্যাংক বড় শিল্পগোষ্ঠী বা করপোরেট ঋণনির্ভর ব্যাংক। করপোরেট ঋণের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই), কৃষি ও রপ্তানি খাতকে সমান অগ্রাধিকার দিয়ে যাচ্ছে ব্যাংকটি। পরিবেশবান্ধব প্রকল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সামাজিক প্রভাব রয়েছে—এমন বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ধারাবাহিকভাবে অর্থায়ন করছে যমুনা ব্যাংক। গত ২ বছরে ২০০ কোটি টাকার বেশি নিট মুনাফা করেছে ব্যাংকটি।
ব্যাংক–সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ব্যাংকটির গ্রাহকসংখ্যা ১৩ লাখ। এসব গ্রাহক ব্যাংকটিতে আমানত জমা রেখেছেন প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা। আর ব্যাংকটির বিতরণ করা ১৮ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে প্রায় ৬৯ শতাংশ করপোরেট খাতে, ১১ শতাংশ এসএমই খাতে ও সাড়ে ৫ শতাংশ রিটেইল বা খুচরা খাতে রয়েছে। অর্থাৎ করপোরেট খাতে ১২ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা, এসএমই খাতে ২ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা, খুচরা খাতে ১ হাজার ৫২ কোটি এবং কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণ খাতে ৩২৭ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে ব্যাংকটি। ব্যাংকটির রয়েছে ৪ হাজার ৪১১ জন কর্মকর্তা। তার মধ্যে নারী কর্মীর সংখ্যা ১৯ শতাংশের কাছাকাছি। ২০২০ সালে নারী কর্মী ছিলেন সাড়ে ১৬ শতাংশ। সে সময় ব্যাংকটিতে নারী কর্মী ছিলেন ৫১২ জন। এখন সেটি বেড়ে হয়েছে ৮৩৭ জন।
জানা যায়, ২০২২ সালে যমুনা ব্যাংকের টেকসই ঋণের প্রকল্পের সংখ্যা ছিল ৫৩ হাজার ৭৬৯। পরের বছর সেটি বেড়ে হয় ৬১ হাজার ৭৯৯টি। সর্বশেষ গত বছরে তাদের টেকসই প্রকল্পের সংখ্যা বেড়ে হয় ৯৭ হাজার ৪১৭। টেকসই খাতে ঋণের পরিমাণও ধীরে ধীরে বাড়ছে যমুনা ব্যাংকের। ২০২৩ সালে টেকসই খাতে ব্যাংকটির ঋণের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা। গত বছর সেটি বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা। যেখানে অনেক ব্যাংক উচ্চ খেলাপি ঋণের চাপে জর্জরিত, সেখানে যমুনা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার তুলামূলক কম। ২০২০ সালে ছিল ২ দশমিক ৯৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কিছুটা বেড়ে ৬ দশমিক ৯২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
ব্যাংকটির কর্মকর্তারা জানান, গ্রাহকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, পুনঃ তফসিল ও আইনগত কাঠামোর মধ্য দিয়ে ঝুঁকিহীন ও সুস্থ ঋণের পরিবেশ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে যমুনা ব্যাংক। ২০২০ থেকে ২০২৪—এই সময়ে যমুনা ব্যাংক নিট মুনাফায় ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। ২০২০ সালে ২৬৭ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছিল। পরের বছরে মুনাফা করে ২৪৭ কোটি টাকা। ২০২২ সালে মুনাফা কমে ১৫৮ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। পরের ২ বছরে মুনাফা করেছে যথাক্রমে ২৩৬ ও ২৭৯ কোটি টাকা।
টেকসই প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি যমুনা ব্যাংক তার সিএসআর বা করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচিতে ধারাবাহিকভাবে ব্যয় বৃদ্ধি করেছে। ২০২০ সালে ব্যাংকটি সিএসআর খাতে ব্যয় করে প্রায় ৩৪ কোটি টাকা, ২০২৪ সালে যা বেড়ে হয় ৩৬ কোটি টাকা। যমুনা ব্যাংক গত বছর স্বাস্থ্যসেবায় ১১ কোটি ১৩ লাখ, শিক্ষায় ৯ কোটি ৮৪ লাখ, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন ও অভিযোজনে ১ কোটি ৬৭ লাখ এবং অন্যান্য খাতে ১৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা সিএসআর ব্যয় করেছে। যমুনা ব্যাংক ফাউন্ডেশন ৯টি দেশজুড়ে ফ্রি চিকিৎসাসেবা ক্যাম্প পরিচালনা করেছে। এতে ৫৩ হাজার রোগী স্বাস্থ্যসেবা নিয়েছেন। এ ছাড়া ঢাকার বস্তি এলাকায় ১২টি মোবাইল ক্যাম্পের আয়োজন করে ফাউন্ডেশন। এতে ৪ হাজার ২১০ জন মানুষ সেবা নিয়েছেন। ফলে এসব উদ্যোগের ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে সমাজে, যা ব্যাংকটির টেকসই উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
যমুনা ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সবাই ব্যবসায়ী। এসব ব্যবসায়ী ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব বজায় রেখে কাজের সুযোগ দিয়েছেন। এ কারণে ব্যাংকটির আর্থিক সূচক ভালো আছে। পরিস্থিতির কারণে এখন কিছু ঋণ খারাপ হলেও এ জন্য পর্ষদ কোনোভাবেই দায়ী নয়।