ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) ও বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বাফেদা) শীর্ষ নেতারা গতকাল রোববার এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেন। এতে ব্যাংক খাতের শীর্ষ নির্বাহীরা উপস্থিত ছিলেন। সোনালী ব্যাংকের মতিঝিলের প্রধান কার্যালয়ে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

ব্যাংকগুলো আমদানিতে ডলারের যে দাম ঠিক করেছে, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের আন্তব্যাংক দামের চেয়ে ৯ টাকা বেশি। কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ডলারের দাম ৯৫ টাকা। এতে সংকট কেটে যাওয়ার আশা করছে ব্যাংকগুলো। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর মধ্যে ডলার বেচাকেনা চালুরও আশা করছেন ব্যাংকাররা।

সভা শেষে এবিবির চেয়ারম্যান ও ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সেলিম আর এফ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘সময়-সময় ডলারের এই দাম পরিবর্তন হবে। এর মাধ্যমে বাজারভিত্তিক ডলারের দামে আমরা প্রবেশ করলাম। এতে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। বর্তমানে ডলারের যে দাম, সেই অনুযায়ী নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজারভিত্তিক এই দাম বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যালোচনা ও তদারকি করবে। তবে দাম নির্ধারিত হবে বাজারের ওপর ভিত্তি করেই।’

তবে আমদানি ও রপ্তানিতে ডলারের দামে পাঁচ টাকার বেশি পার্থক্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশের নিট পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, যারা এটা নির্ধারণ করেছে, দেশ মনে হচ্ছে তারাই চালাবে। ডলারের দামে এত পার্থক্য কখনো হতে পারে না। এর মাধ্যমে পুরো দেশ ক্ষতিতে পড়বে। মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাবে। একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহসভাপতি শহিদউল্লাহ আজিম প্রথম আলোকে বলেন, ডলারের দামের এত পার্থক্যে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে।

গত মে মাস থেকে ডলারের বাজারে অস্থিরতা চলছে। আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয় দিয়ে ডলারের চাহিদা মিটছে না। এতে সংকট তৈরি হয়েছে। এর বাইরে রয়েছে সরকারি ও বেসরকারি ঋণ পরিশোধ, জাহাজ ও বিমানভাড়া, প্রযুক্তি ও সেবা খাতে বিদেশি বিল, শিক্ষা-চিকিৎসাসহ আরও নানা খাতে ডলারের খরচ। আমদানি কমাতে নানা পদক্ষেপের ফলে ঋণপত্র খোলা কমেছে, বেড়েছে প্রবাসী ও রপ্তানি আয়ও।

তারপরও ডলারের দাম স্থিতিশীল রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে, প্রতিনিয়ত ডলার বিক্রি করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভও কমে হয়েছে ৩ হাজার ৭০৬ কোটি ডলার, গত বছরের শেষের দিকে রিজার্ভ ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে প্রতি ডলারের দাম ৮৬ থেকে বাড়িয়ে ৯৫ টাকা নির্ধারণ করেছে। যদিও ব্যাংকগুলোতে ডলার কেনাবেচা হচ্ছে আরও অনেক দামে। ব্যাংকগুলো গত বৃহস্পতিবারও আমদানিতে ডলারের দাম নিয়েছে ১০৭ টাকা পর্যন্ত। প্রবাসী আয় এনেছে ১১৪ টাকা পর্যন্ত দামে ও রপ্তানি আয় নগদায়ন করেছে ১০৩-১০৪ টাকা দামে। ফলে ব্যাংকগুলোর নতুন সিদ্ধান্ত কতটা কাজে দেবে, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে।

ডলার-সংকটে করণীয় নিয়ে বৃহস্পতিবার এবিবি ও বাফেদার নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, ব্যাংকগুলো নিজেরাই দাম নির্ধারণ করবে। ডলারের দাম জোগান ও চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে নির্ধারিত হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের দামে হস্তক্ষেপ করবে না, তবে দাম পর্যবেক্ষণ করবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এবিবি ও বাফেদার নেতারা গতকাল সভায় বসেন। গতকালই সভার সিদ্ধান্ত ব্যাংকগুলোকে চিঠির মাধ্যমে জানিয়ে দেন বাফেদার চেয়ারম্যান ও সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আফজাল করিম। চিঠিতে বলা হয়, সব ব্যাংক প্রতিদিন সকাল ১০টার মধ্যে প্রতি ডলারের গড় খরচ বাফেদাকে জানাবে। বাফেদা সব ব্যাংকের ডলারের গড় দাম প্রতিদিন প্রকাশ করবে।

সভা শেষে এবিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডলারের দাম নির্ধারিত হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর মধ্যে ডলার বেচাকেনাও চালু হয়ে যাবে। যে ব্যাংকের রপ্তানি আয় নেই, তারা অন্য ব্যাংক থেকে ডলার কিনতে পারবে। আমদানি যেভাবে কমছে, আশা করছি ডলার-সংকটও কেটে যাবে। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে দাম আরও কমে আসবে।’

বাফেদার চিঠিতে বলা হয়, নিজস্ব বা অন্যের এক্সচেঞ্জ হাউস, রেমিট্যান্স কোম্পানি, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন, মানিগ্রামসহ যার মাধ্যমে প্রবাসী আয় আসুক না কেন, ডলারের দাম হবে ১০৮ টাকা। আর প্রবাসী আয় ছাড়া রপ্তানি আয়সহ সব ধরনের আয়ে ডলারের দাম হবে ৯৯ টাকা। পাঁচ দিনের গড় দামের চেয়ে এক টাকা বেশি দামে আমদানি বিল নিষ্পত্তিতে ডলারের দাম নির্ধারণ করা যাবে। ক্রেডিট কার্ড বিল ও শিক্ষার্থী ফাইলে ডলারের দাম হবে নগদ ডলার বিক্রির দামে।