যেহেতু ছয় বছর পর থেকেই ঋণ পরিশোধ করতে হবে, তাই দেখা যাবে প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়ে যাবে। এতে লেনদেনের ভারসাম্যে চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
জাহিদ হোসেন, সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংক, ঢাকা কার্যালয়

সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, শর্টটার্ম ম্যাচিউরিটি লোন বা স্বল্পমেয়াদি এ ঋণ ১২ বছরে পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে ছয় বছর রেয়াতকাল। এ ঋণে কোনো সুদ থাকবে না, সেবা মাশুলও থাকবে না। বলা যায়, প্রায় বিনা সুদেই এ ঋণ মিলবে। শুধু ঋণের কিস্তি পরিশোধ করলেই হবে। তবে স্বল্পমেয়াদি ঋণ হওয়ায় অবশ্য কিস্তির পরিমাণ বিশ্বব্যাংকের অন্য ঋণের তুলনায় বেশি হবে। জানা গেছে, ১২ বছর মেয়াদি এ ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে সপ্তম বছর থেকে। যেমন ১০০ ডলার ঋণ নিলে সপ্তম বছর থেকে দ্বাদশ বছর পর্যন্ত ১৬ দশমিক ৬৭ ডলার করে প্রতিবছর কিস্তি পরিশোধ করতে হবে।

এ ঋণের অর্থ কোন খাতে খরচ করা যথাযথ হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্পের চেয়ে বাজেট সহায়তা হিসেবে এ ঋণ নেওয়া বেশি যৌক্তিক। এ মুহূর্তে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়াতে বাজেট সহায়তা হিসেবে ডলার আনার বিকল্প নেই।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এ ঋণ প্রকল্প সহায়তা হিসেবে কাজে লাগালে বিপদ ঘটতে পারে। কারণ, বাংলাদেশে প্রকল্প বাস্তবায়নে বেশ সময় লাগে। যেহেতু ছয় বছর পর থেকেই ঋণ পরিশোধ করতে হবে, তাই দেখা যাবে প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়ে যাবে। এতে লেনদেনের ভারসাম্যে চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

তাই বিশ্বব্যাংকের স্বল্পমেয়াদি এ ঋণ বাজেট সহায়তা হিসেবে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, বাজেট সহায়তা হিসেবে এ ঋণ নেওয়াই বেশি যৌক্তিক। কারণ, বাজেট সহায়তা নিলে কিছু সংস্কার করতে হয়। আর্থিক খাত, জ্বালানি খাতসহ বেশ কিছু খাতে সংস্কার প্রয়োজন।

বিশ্বব্যাংকের আইডিএ থেকে এর আগেও বাজেট সহায়তা নিয়েছে বাংলাদেশ। গত অর্থবছর বিশ্বব্যাংকের ডেভেলপমেন্ট পলিসি ক্রেডিট (ডিপিসি) নামে তহবিল থেকে বাংলাদেশ ২৫ কোটি ডলার পেয়েছে। চলতি বছরে আরও ২৫ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলাপ–আলোচনা চলছে।

আইডিএ থেকে নমনীয় ও কম সুদে ঋণ পায় গরিব ও নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলো। প্রতি তিন বছর পরপর এসব দেশের জন্য তিন বছর মেয়াদি ঋণ কর্মসূচি ঘোষণা করে বিশ্বব্যাংক। সর্বশেষ আইডিএ-২০–এর মেয়াদ ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত। বাংলাদেশ চাইলে আইডিএ-২০–এর স্বল্পমেয়াদি ঋণের জন্য বরাদ্দ করা ৬০ কোটি ডলারের পুরোটাই চলতি অর্থবছরে ব্যবহার করতে পারবে।

বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের নতুন ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্টিন রাইজার তিন দিনের বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। সফরকালে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালসহ সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি। বৈঠকে অনানুষ্ঠানিকভাবে আইডিএ ঋণসহ বিশ্বব্যাংকের ঋণসহায়তার যাবতীয় বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

আইডিএ থেকে ৬০০ কোটি ডলার ঋণ

কোভিডসহ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গরিব দেশগুলোর জন্য আইডিএ-২০–তে ৯ হাজার ৩০০ কোটি ডলার বরাদ্দ রেখেছে বিশ্বব্যাংক। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আইডিএ-২০ থেকে আগামী তিন বছরে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার পর্যন্ত পেতে পারে বাংলাদেশ। আইডিএ-২০ আবার চার শ্রেণিতে বিভক্ত। শ্রেণি চারটি হলো কোর আইডিএ, স্কেল–আপ, স্কেল আপ শর্টটার্ম ম্যাচিউরিটি ((এসইউডব্লিউ-এসএমএল) ও রিজিওনাল উইন্ডো (আরডব্লিউ)। এ চার শ্রেণির মধ্যে স্কেল–আপ শর্টটার্ম ম্যাচিউরিটি নতুন শ্রেণি। এ শ্রেণি থেকেই মিলবে বিনা সুদে ১২ বছরের জন্য ঋণসুবিধা।

বাংলাদেশ আইডিএ–২০ থেকে আগামী তিন বছরে যে ঋণ পাবে, তার মধ্যে ‘কোর আইডিএ’ থেকে মিলবে ২৫০ কোটি ডলার। এ ঋণের সুদের হার হতে পারে দশমিক ৭৫ শতাংশ। ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ৪০ বছর।

আবার অর্থনীতিতে গতি আনবে, এমন রূপান্তরমূলক বড় প্রকল্পে লন্ডন ইন্টার ব্যাংক লেনদেনের সুদহার বা লাইবর রেটে মিলতে

পারে আরও ২০০ কোটি ডলার। এটি স্কেল-আপ শ্রেণির ঋণ। মূলত বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য এখান থেকে ঋণ মিলবে। ঋণ পরিশোধের সময় ২৫ থেকে ৩০ বছর। স্কেল আপ-শর্টটার্ম ম্যাচিউরিটি (এসইউডব্লিউ-এসএমএল) শ্রেণি থেকে বিনা সুদের ১২ বছর মেয়াদি ঋণ মিলবে। এতে বাংলাদেশের বরাদ্দ থাকতে পারে ৬০ কোটি ডলার।

সর্বশেষ রিজিওনাল উইন্ডো (আরডব্লিউ) থেকে আরও প্রায় ১০০ কোটি ডলার মিলবে। এখান থেকে আঞ্চলিক পর্যায়ে বাণিজ্য ও অবকাঠামো উন্নয়নে বহুদেশীয় প্রকল্পের জন্য সহজ ও নমনীয় শর্তের ঋণ পাবে বাংলাদেশ।

বিশ্বব্যাংকের আইডিএ-২০ থেকে কোন দেশ কত অংশ ঋণ পাবে, তা ঠিক করা হয়েছে। আইডিএ-২০–তে মোট বরাদ্দ করা ৯ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের মধ্যে সব মিলিয়ে সাড়ে ৬ শতাংশ ঋণ পাবে বাংলাদেশ। আফ্রিকার ৩৯টি দেশ আইডিএ-২০–এর ৭০ শতাংশ ঋণ পাবে। এর আগে আইডিএ-১৯–এ গরিব দেশের জন্য বরাদ্দ ছিল ৮ হাজার ২০০ কোটি ডলার। সেখান থেকে বাংলাদেশ সাড়ে ৫ শতাংশ ঋণ পেয়েছে। বাংলাদেশ হলো আইডিএ থেকে সবচেয়ে বেশি ঋণ পাওয়া দেশগুলোর একটি।

ব্যাংক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন