সিপিডির সংলাপ
আবারও ব্যাংক কমিশনের দাবি
ব্যাংক কমিশন এই খাতের গোড়ার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পথ তুলে ধরবে। সরকার এ কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিয়েও পরে পিছিয়ে গেছে।
দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও তদারকব্যবস্থা, সুশাসনের অভাব, সংস্কারের অভাব, উচ্চ হারের খেলাপি ঋণ ও ব্যাংক খাতকে শক্তিশালী করার বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা—এগুলোকে ব্যাংক খাতের অন্যতম চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
সিপিডি আরও বলেছে, প্রাতিষ্ঠানিক, প্রশাসনিক, আইনগত ও তথ্যগত—এ চারটি হচ্ছে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। পুরো ব্যাংক খাত যেখানে দুর্বল থেকে দুর্বলতর হচ্ছে, সেখানে দরকার এখন লক্ষ্য ও সময়ভিত্তিক, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন ব্যাংক কমিশন গঠন।
অন্যদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ব্যাংক খাতে ভুল নীতি প্রণীত হচ্ছে। মুদ্রানীতির প্রধান চলকগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল হোটেলে বসে—অদ্ভুত! কোনো দিন এ রকম ঘটনা আগে শুনিনি।
ঢাকার মহাখালীর ব্র্যাক-ইন সেন্টারে গতকাল শনিবার ‘সংকটে অর্থনীতি: কর্মপরিকল্পনা কী হতে পারে?’ শীর্ষক সিপিডির সংলাপে এসব কথা উঠে আসে। সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহানের সঞ্চালনায় সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, বিশেষ অতিথি ছিলেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী।
প্রতিবেদনে ফাহমিদা খাতুন বলেন, খেলাপি ঋণ যা দেখানো হয়, বাস্তবে তা আরও বেশি। অর্থনীতিবিদেরা ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ) এ কথা বলে থাকে। খেলাপি ঋণ এখন কত, তা সবার মুখস্থ (১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা)। এই পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ব্যাংকগুলোতে মূলধনের ঘাটতি থেকেই যাবে—সমস্যাও বাড়তে থাকবে।
সিপিডি বলেছে, ব্যাংক খাতের দুর্বলতার সঙ্গে কোভিড-১৯ ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্পর্ক নেই। কারণ, ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল। ব্যাংকের পর্ষদে যে এক পরিবার থেকে অনেক সদস্য থাকার বিধান চালু আছে, তা কমানো দরকার। আর খেলাপি ঋণের পরিমাণ নির্ণয় করা দরকার আইএমএফের মান অনুযায়ী। প্রতারণা ও জালিয়াতি রোধে ব্যাংকগুলোতে সমন্বিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতিও রাখতে হবে বলে মনে করছে সিপিডি।
মোটা দাগে দুটি বিষয় সামনে রেখে ব্যাংক খাতে সংস্কারের সুপারিশ করেছে সিপিডি। একটি হচ্ছে সমন্বিত সংস্কার; কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও এর আওতায় শক্তিশালী হবে। এ জন্য আইনি পরিবেশ এবং এ খাতের তথ্যের অবাধ সরবরাহের নিশ্চয়তা থাকবে। আরেকটি হচ্ছে ব্যাংক কমিশন গঠন; এ কমিশন ব্যাংক খাতের গোড়ার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পথ তুলে ধরবে।
উল্লেখ্য, প্রায় এক দশক ধরেই সিপিডি ব্যাংক কমিশন গঠনের কথা বলে আসছে। সরকার মাঝে উদ্যোগ নিয়েও আর তা গঠন করেনি।
আলোচনা
আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘অন্যদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ব্যাংক খাতে ভুল নীতি প্রণীত হচ্ছে। মুদ্রানীতির প্রধান চলকগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল হোটেলে বসে—অদ্ভুত! কোনো দিন এ রকম ঘটনা আগে শুনিনি। ২ শতাংশ জমা দিয়ে ঋণ পুনঃ তফসিল করার সুযোগও দেওয়া হয়েছে ব্যাংক খাতে, যা ঠিক হয়নি।
বর্তমানে চার রকমের ডলারের দর নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সালেহউদ্দিন আহমেদ। বলেন, নগদ জমার হার (সিআরআর) ও বিধিবদ্ধ জমা (এসএলআর) মাফ করে দেওয়ার ঘটনাও এখন ব্যাংক খাতে দেখা যাচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে এত দুর্বল হলে চলবে কী করে?
সালেহউদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, ব্যাংক খাতে সংস্কার না করে উল্টো পথে হেঁটেছে সরকার। এক পরিবারের দুজনের বদলে চারজন এবং দুই মেয়াদে ৬ বছরের পরিবর্তে টানা ৯ বছর বেসরকারি ব্যাংকের পর্ষদে পরিচালক থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আর নিরীক্ষায় দুই বছর আগে ধরা পড়া একটি ব্যাংকের অনিয়ম সম্পর্কে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনো ‘দেখছি, দেখব’ করছে। তিনি বলেন, ক্ষমতা দুইভাবে প্রয়োগ করা যায়; কষ্ট দেওয়া এবং পথের বাধা সরিয়ে দেওয়া। সময় এসেছে, এখন পথের বাধা সরানোর উদ্যোগ নেওয়ার।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, অর্থনীতিতে কী ঘটেছিল, বিভিন্ন ঘটনায় তার প্রমাণ পাওয়া যায়। অভ্যন্তরীণ চাহিদা যেহেতু বাড়ছিল, সেহেতু এর ব্যবস্থাপনাও দেখার দায়িত্বের কথা এসে যায়। মূল্যস্ফীতি যখন বাড়তে থাকল, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তখন কী করল?
জাহিদ হোসেন আরও বলেন, পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান ও ব্যবসায়ী রূপালী চৌধুরীদের জন্য মূল্যস্ফীতি সমস্যা নয়; দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য এটা জীবিকার সমস্যা। দরিদ্রদের জন্য যথাযথ নীতি পদক্ষেপ নিতে হবে।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘সমস্যা হচ্ছে যথাযথ নীতি প্রণয়ন করতে না পারা। ভারতের মূল্যস্ফীতি এখন ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ। তারপরও তারা নীতি সুদহার বাড়িয়েছে। আমরা এখনো সে পথে যাইনি। সরকার বলছে, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে সংকট কেটে যাবে, কিন্তু আমি তা বিশ্বাস করি না।’
ব্যাংক খাতের সাম্প্রতিক প্রবণতা নিয়ে আহসান মনসুর বলেন, ‘খারাপ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে মানুষ এখন ভালো ব্যাংকে রাখছে। দেখলাম, ব্র্যাক ব্যাংকে আমানত প্রবৃদ্ধি ৩৪ শতাংশ। এত প্রবৃদ্ধি আমরা আশাই করিনি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ঋণ নিয়ে যাঁরা পুঁজিবাজারে ব্যবসা করেন, তাঁদের সুদের হার এখনো ১৭ শতাংশ। এটা অযৌক্তিক। পুঁজিবাজারকে কবরস্থানে পাঠানো হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।