ব্যাংক খাতে অনিয়মের বিচার না হলে আবার সংকট হতে পারে
যেসব ব্যক্তির জন্য দেশের ব্যাংক খাতে দুরবস্থা তৈরি হয়েছে, তাঁদের এখনো জবাবদিহি ও শাস্তির আওতায় আনা হয়নি। উল্টো ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের মাধ্যমে তাঁদের ব্যাংকে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আবার ব্যাংকগুলোকে রক্ষা করতে সাধারণ করদাতাদের অর্থ ব্যবহার হচ্ছে। এভাবে চললে ব্যাংক খাতে ভবিষ্যতে আরেকটি ভয়াবহ সংকটের পথ তৈরি হবে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিডিবিএল ভবনে আজ শনিবার ভয়েস ফর রিফর্ম আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এ কথা বলেন। গোলটেবিলের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল ‘সংশোধিত ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন: আবারও ঝুঁকির মুখে ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা’। ভয়েস ফর রিফর্মের সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের (সোয়াস) অর্থনীতির অধ্যাপক মুশতাক খান, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন এ কে এম ওয়ারেসুল করিম, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমদ চৌধুরী, প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন শওকত হোসেন, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, চার্টার্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট (সিএফএ) সোসাইটি বাংলাদেশের সভাপতি আসিফ খান।
সভায় বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ব্যাংক খাতের চোরদের এখনো ধরা হয়নি। এস আলমসহ ইসলামী ব্যাংক দখলের নেপথ্য সব কারিগরের বিচার হওয়া উচিত। এ ছাড়া ব্যাংক খাতকে শক্ত ভিতের ওপরে দাঁড় করাতে তিনটি কাজ জরুরি। প্রথমত, ব্যাংক খাতের চোরদের ধরা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, সর্বত্র নগদবিহীন লেনদেন চালুসহ পদ্ধতিগত সংস্কার। তৃতীয়ত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। যার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংককে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা জরুরি।
এস আলমসহ ইসলামী ব্যাংক দখলের নেপথ্য কারিগরদের বিচার হওয়া উচিত বলে অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেন বদিউল আলম মজুমদার। এ সময় তিনি ডেইলি স্টার–এর একটি সংবাদ উদ্ধৃত করে বলেন, চট্টগ্রামের জেএমসি বিল্ডার্স নামক একটি স্বল্পপরিচিত কোম্পানি বিপুল শেয়ার কিনে ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদে জায়গা করে নেয়। সেই সময় ওই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে বোর্ডে বসেছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন, যিনি এখন মহামান্য (রাষ্ট্রপতি)।
অধ্যাপক মুশতাক খান বলেন, ব্যাংক খাত থেকে যে চুরি হয়েছে, এটি ছোটখাটো সমস্যা নয়। সুসংগঠিত রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় রাষ্ট্র দখলের মাধ্যমে এই চুরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর থেকে পিয়ন পর্যন্ত সবাই জানত যে কী হচ্ছে। যেহেতু সিস্টেমের ভেতরে ৯৫ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত, তাই তারা একে অপরকে রক্ষা করতে তথ্য গোপন করছে। এই কাঠামোগত সমস্যার কারণে আসল তথ্য বেরিয়ে আসছে না।
প্রস্তাবিত ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ নিয়ে সরকার খুবই নিম্নমানের চালাকি করেছে বলে মন্তব্য করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন এ কে এম ওয়ারেসুল করিম। তিনি বলেন, অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, ব্যাংক রেজোল্যুশনের সিদ্ধান্তের আলোকে তালিকাভুক্ত হওয়ার ‘অব্যবহিত পূর্বের’ বা সদ্য সাবেক শেয়ারধারীরা মালিকানায় ফেরার আবেদন করতে পারবেন। এটি অত্যন্ত রহস্যজনক। অর্থাৎ এর মাধ্যমে কুয়েত ফাইন্যান্স হাউসের মতো পুরোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকদের ফেরার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তার পরিবর্তে যাঁরা অনৈতিক উপায়ে মালিকানা নিয়েছিলেন, তাঁদেরই আবার ফেরার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের জবাবদিহির আওতায় আনার তাগিদ দেন বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমদ চৌধুরী। তিনি বলেন, যাদের জন্য আজকে এই সমস্যা, তাদের যদি শাস্তির মুখোমুখি করা না হয়, তবে যতই রেজোল্যুশন করা হোক, তাতে কোনো কার্যকর ফল আসবে না। পুনঃতফসিল করা ঋণ পুরোপুরি পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত তার শ্রেণিবিন্যাস বা খেলাপি অবস্থার পরিবর্তন হওয়া উচিত নয়।
প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন শওকত হোসেন বলেন, ‘দেশে কিছু ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার পর্যায়ে চলে যাবে, এটা অবধারিত ছিল। ২০২২ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলেছিল, দেশের ব্যাংকিং খাতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা কী, তা আমরা কম-বেশি সবাই জানতাম। বাংলাদেশ ব্যাংক যে জানত না, তা না। কিন্তু তারা ছিল রাজনীতিকরণের কাছে অসহায় বা তাদের সঙ্গী অথবা দুটিই।’ কোনো সরকার ব্যাংক বন্ধের দুর্নাম নিতে চায়নি উল্লেখ করে শওকত হোসেন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারও একীভূতকরণের দিকে গেছে। বিভিন্ন বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে দুটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করার মাধ্যমে সফল হওয়া খুব কঠিন কাজ। সেখানে পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক একসঙ্গে মিলে সফল হবে—এটা খুবই দূরবর্তী আকাঙ্ক্ষা।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, ব্যাংকিং আইন দিয়ে সদর দরজা বন্ধ করা হলেও শেয়ারবাজারের মতো পেছনের দরজা খোলা রেখে এই লুটপাট বন্ধ করা সম্ভব নয়।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন ও সুশাসনের কথা বলা হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই।
ব্যাংকিং খাতের গভীর ক্ষত সারাতে তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে আমানতকারীদের দীর্ঘমেয়াদি বন্ড দেওয়ার পরামর্শ দেন সিএফএ সোসাইটি বাংলাদেশের সভাপতি আসিফ খান।