প্রশিক্ষণের জন্য প্রকল্পের অর্থ নগদে তুলে নেওয়ার অভিযোগ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে

বাংলাদেশ ব্যাংকছবি: সংগৃহীত

অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের জন্য গঠিত তহবিল থেকে ২ কোটি টাকা নগদে তুলে নিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা। বিদেশে প্রশিক্ষণের নামে এই অর্থ তুলে নিয়েছেন তাঁরা।

নিয়ম অনুযায়ী, এসএমই–সংক্রান্ত বিষয়ে বিদেশে প্রশিক্ষণ গ্রহণের ক্ষেত্রে এই তহবিল থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অর্থ খরচের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে বৈধ পথে সেই অর্থ বিদেশে নিতে হয়। এ জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও দাখিল করতে হয় সংশ্লিষ্টদের। কিন্তু অভিযুক্ত কর্মকর্তারা বিদেশে প্রশিক্ষণের নামে তহবিল থেকে নগদে অর্থ সংগ্রহ করলেও তা বিদেশে পাঠানো হয়নি।  মূলত প্রশিক্ষণের নামে তহবিল থেকে টাকা তুলে তা নিজেদের মধ্যে ভাগ–বাঁটোয়ারা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ অনিয়মের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের চার কর্মকর্তা তিন দফায় দুই মাসে পাঁচটি দেশে প্রশিক্ষণ সফরে যান। এসব কর্মকর্তা হলেন পরিচালক মুনিরা ইসলাম, অতিরিক্ত পরিচালক তারিকুল ইসলাম ও টুটুল হোসেন মল্লিক ও যুগ্ম পরিচালক প্রশান্ত মোহন চক্রবর্ত্তী। এসব কর্মকর্তা প্রশিক্ষণের জন্য দুই মাসে থাইল্যান্ড, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়া সফর করেন। নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশের কোনো কর্মকর্তারা বিদেশে কোনো প্রশিক্ষণে গেলে সেই প্রশিক্ষণের অংশগ্রহণের জন্য নির্ধারিত মাশুল বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের মাধ্যমে বিদেশে পাঠাতে হয়। কিন্তু উল্লিখিত কর্মকর্তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিলের অর্থে বিদেশি প্রশিক্ষণে গেলেও প্রশিক্ষণের কোনো অর্থ নিয়ম মেনে বিদেশে পাঠাননি। বরং নগদে এই অর্থ তুলে নিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগ–বাঁটোয়ারা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে । বিষয়টি অভ্যন্তরীণভাবে জানাজানি হওয়ার পর প্রশিক্ষণের তথ্য যাচাই–বাছাইয়েরও উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগ। তাতে দেখা যায়, এই চার কর্মকর্তা যেসব প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন, সেগুলোর আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিল বিভিন্ন দেশের ট্রাভেল এজেন্সি।  

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ভিত্তিতে প্রশিক্ষণের অর্থ তহবিলের হিসাব থেকে উত্তোলন করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, প্রশিক্ষণের খরচ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর কথা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সফরের সব আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে। এখন এটা নিয়ে অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখব। এই টাকা কোথায় ব্যবহার করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে।’

জানা যায়, ২০১৭ সালের নভেম্বরে প্রায় ২৪ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ নিয়ে সেকেন্ড স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম সাইজড এন্টারপ্রাইজ ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (এসএমইডিপি-২) শীর্ষক এই পুনঃ অর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়। এ তহবিলের উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রাম ও শহরের উদ্যোক্তাদের স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া, যাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা সম্প্রসারিত হতে পারে। মূল প্রকল্পটি ২০২৪ সালে শেষ হয়। পূর্ববর্তী প্রকল্পের অব্যবহৃত অর্থ থেকে ২০২৫ সালে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার একটি নতুন তহবিল গঠন করা হয়। এই তহবিল থেকে ৯৫০ কোটি টাকা সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারি ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ করা হয়েছিল। এই বিল থেকে প্রায় ৪৬ কোটি ৭৪ টাকা সুদ বাবদ আয় হয়েছে। এ আয়ের মধ্যে ৪০ কোটি টাকা সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে দেওয়া হয়। বাকি ৬ কোটি টাকার মধ্যে গবেষণার জন্য ২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা রাখা হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য রাখা হয় ৪ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের যে চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে, সেই বিষয়ে তাঁদের একজনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি সরাসরি এটা নিয়ে কথা বলেননি। তিনি জানান, এ বিষয়ে যা বলার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র বলবেন।