করোনাভাইরাসের কারণে গ্রাহকদের ঋণ ফেরতে যেমন ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, তেমনি ব্যাংকগুলোকে এসব ঋণের হিসাবায়নেও ছাড় দেওয়া হয়েছে। এ কারণে নতুন করে কোনো ঋণ খেলাপি হচ্ছে না। বাড়তি কোনো নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখার দরকারও পড়ছে না। এরপরও জুন শেষে সরকারি-বেসরকারি ১১ ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে।
অবশ্য এসব ব্যাংকের বেশির ভাগ করোনাভাইরাস প্রকোপের আগে থেকেই সমস্যায় রয়েছে। করোনার মধ্যে বিশেষ ছাড়েও ব্যাংকগুলো নিজেদের সেই সমস্যা থেকে বের হতে পারেনি। বরং কারও কারও অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে।
জুন শেষে মূলধন ঘাটতিতে থাকা ১১ ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, অগ্রণী, বেসিক, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংক। বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে এবি, বাংলাদেশ কমার্স, আইসিবি ইসলামিক, সাবেক ফারমার্স বা পদ্মা ব্যাংক। ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী ন্যূনতম যে মূলধন থাকা প্রয়োজন, এসব ব্যাংকের তা নেই।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলো বিভিন্ন আর্থিক কেলেঙ্কারির পর এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এ জন্য দীর্ঘদিন ধরে মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। আর সরকারি বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো বেশি সুদে তহবিল নিয়ে কম সুদে ঋণ দেওয়ার কারণে ঘাটতিতে পড়েছে, ঋণেও অনিয়ম হয়েছে। আবার বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেও ঘাটতি দেখা দিয়েছে অনিয়ম-জালিয়াতির কারণে। এর প্রভাবে ব্যাংকগুলোর মূলধনে আঘাত এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মধ্যে জুন শেষে অগ্রণী ব্যাংকের ১ হাজার ৯৬০ কোটি, বেসিক ব্যাংকের ১ হাজার ৯২৭ কোটি, জনতা ব্যাংকের ৩৪৫ কোটি, রূপালী ব্যাংকের ৬৬৭ কোটি এবং সোনালী ব্যাংকের ৩ হাজার ৫২৭ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে।
সরকারি ব্যাংকগুলোর এ ঘাটতির পেছনে বড় কারণ ঋণ–অনিয়ম। সোনালী ব্যাংকের ঘাটতি হয়েছে হল–মার্কসহ বিভিন্ন ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে। অগ্রণীর ঘাটতি হয়েছে চট্টগ্রামভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে। বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি হয়েছে সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাইয়ের সময় দেওয়া ঋণ আদায় না হওয়ায়। জনতার ঘাটতি হয়েছে অ্যাননটেক্স ও ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণ জালিয়াতির কারণে। রূপালীর ঘাটতির কারণ স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন শাখার ঋণ জালিয়াতি। সরকারি ব্যাংকগুলোর কেউ কেউ এখনো মূলধনের জন্য সরকারের ওপর নির্ভরশীল।
সোনালী ব্যাংক সম্প্রতি সরকারের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকা মূলধন চেয়েছে। অন্য ব্যাংকগুলোও মূলধনের জন্য সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, নতুন করে আর মূলধন জোগান দেওয়া হবে না।
বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিসুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ব্যাংকের ঋণের বড় অংশ খেলাপি হয়েছে। আবার উচ্চ সুদে অনেক আমানত নেওয়া হয়েছে। ফলে ব্যাংকের আয় নেই বললেই চলে। এই কারণে মূলধন ঘাটতিও কমছে না। আমরা চেষ্টা করছি, নতুন করে ব্যাংকটি ঠিক করতে। এ জন্য কম সুদে তহবিল খুঁজছি।’
বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে গত জুন শেষে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া এবি ব্যাংকের ৩২৯ কোটি, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের ১ হাজার ৬৪২ কোটি, সাবেক ফারমার্স বা বর্তমান পদ্মা ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪৬১ কোটি টাকায়। এর মধ্যে কমার্স ব্যাংকের ঘাটতি হয়েছে ঋণ জালিয়াতির কারণে। এবি ব্যাংকের দুরবস্থা হয়েছে অফশোর ইউনিটের ঋণ–অনিয়ম ও স্থানীয় ঋণ জালিয়াতির কারণে। আর পদ্মা ব্যাংক ডুবছে যাত্রা শুরুর পর ব্যাংকটিতে যেসব ঋণ–অনিয়ম ও জালিয়াতি হয়েছে তার কারণে। সরকারি ব্যাংকগুলো পদ্মা ব্যাংকে ৭১৫ কোটি টাকা মূলধন জোগান দিয়েছে, এরপরও ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়নি। এখন সরকারি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হওয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছে পদ্মা ব্যাংক।
বৈশ্বিক নিয়ম অনুযায়ী, সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় এখন ব্যাংকগুলোকে অতিরিক্ত মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। কিন্তু জুন শেষে দেশের ১৮টি ব্যাংক অতিরিক্ত মূলধন সংরক্ষণ করতে পারেনি। ঘাটতিতে থাকা ১১ ব্যাংকের পাশাপাশি অন্য ৭টি ব্যাংক হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি, গ্লোবাল ইসলামী, ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি, এনআরবি কমার্শিয়াল, পূবালী ও ইউনিয়ন ব্যাংক।