সর্বনিম্ন বেতন-ভাতায় খরচ বাড়বে ২৫০০ কোটি টাকা

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে গতকাল অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিএবি ও এবিবির নেতারা এ তথ্য তুলে ধরেন।

বেসরকারি খাতের ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সর্বনিম্ন বেতন-ভাতা বেঁধে দেওয়া সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে দাবি জানিয়েছেন ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরা (এমডি)। তাঁরা জানিয়েছেন, এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে হলে প্রতিবছর প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা খরচ বেড়ে যাবে। এতে মুনাফা কমে যাবে। আর মুনাফা কমলে সরকারের রাজস্ব আয় কমবে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা। এ জন্য বেঁধে দেওয়া বেতন-ভাতা কার্যকরে বাড়তি সময় চেয়েছে ব্যাংকগুলো।

গত বৃহস্পতিবার ব্যাংকারদের সর্বনিম্ন বেতন-ভাতা বেঁধে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগামী মার্চ থেকে কার্যকর করতে বলা হয় এ–সংক্রান্ত নির্দেশনায়। এ অবস্থায় গতকাল বুধবার দুপুরে বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যানদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) ও প্রধান নির্বাহী বা এমডিদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) নেতারা এ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করেন। গভর্নর ফজলে কবির ও দুই ডেপুটি গভর্নরের সঙ্গে আড়াই ঘণ্টাব্যাপী এ নিয়ে আলোচনা করেন তাঁরা।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বিএবি ও এবিবির নেতারা বৈঠকে নতুন বেতন-ভাতা কার্যকর হলে ব্যাংক খাত ও অর্থনীতিতে কী ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, তা তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, ব্যাংকারদের সর্বনিম্ন বেতন কার্যকর করতে হলে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা খরচ বেড়ে যাবে। মুনাফা কমে যাবে। এর প্রভাব পড়বে শেয়ারের দামে ও সরকারের রাজস্ব আয়ে। এ ছাড়া ব্যাংক খাতে নতুন কর্মসংস্থানও বাধাগ্রস্ত হবে। বেতন-ভাতা বেড়ে গেলে অন্য খাতের কর্মীরাও ব্যাংকের চাকরির জন্য ছোটাছুটি শুরু করবে।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিএবি ও এবিবি নেতাদের কোনো আশ্বাস দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। তবে বেতন-ভাতা কার্যকরের সময় পিছিয়ে দিতে পারে বলে জানা গেছে।

বেতন-ভাতা নির্ধারণের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয় বৈঠকে। এতে সরকারি ও বেসরকারি অন্য খাতের বেতন কাঠামো, জীবনযাত্রার ব্যয়, ব্যাংকের অস্বাভাবিক মুনাফাসহ আরও নানা বিষয় তুলে ধরা হয়।

বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, বেতন-ভাতা কার্যকরে বাড়তি সময় চেয়েছে ব্যাংকগুলো। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত পরে জানানো হবে।

সভায় উপস্থিত ছিলেন বিএবি ও এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোরশেদ আলম, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি ও বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ, মেঘনা ব্যাংকের চেয়ারম্যান এইচ এন আশিকুর রহমান ও ইস্টার্ণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরী। এবিবির পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির চেয়ারম্যান ও ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি সেলিম আর এফ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের এমডি খন্দকার রাশেদ মাকসুদ, ভাইস চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ব্যাংকের ট্রেইনি সহকারী কর্মকর্তা (ক্যাশ ও জেনারেল) এবং সহকারী কর্মকর্তাদের সর্বনিম্ন বেতন হতে হবে ২৮ হাজার টাকা। শিক্ষানবিশকাল শেষে বেতন-ভাতা দাঁড়াবে ৩৯ হাজার টাকা। অফিস সহকারী, নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও মেসেঞ্জারদের সর্বনিম্ন বেতন হবে ২৪ হাজার টাকা। প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা কমানো যাবে না। এ ছাড়া চাকরি স্থায়ীকরণ ও বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আমানত সংগ্রহের লক্ষ্যও বেঁধে দেওয়া যাবে না।

গতকালের বৈঠকে ব্যাংকমালিক ও এমডিদের পক্ষ থেকে যুক্তি তুলে ধরা হয় এবং লিখিত চিঠিও দেওয়া হয়। বিএবির চিঠিতে বলা হয়, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে হলে পুরো বেসরকারি খাতের কর্মীদের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের কর্মীদের ক্ষেত্রে আমানত সংগ্রহকে বিবেচনায় না নিলে তাঁদের চাকরি স্থায়ীকরণ ও বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে না। আর অফিস সহায়ক ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর যে বেতনভাতা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, তা পোশাক খাতের দক্ষ শ্রমিকের বেতনের কয়েক গুণ।

বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএবি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, ‘সর্বনিম্ন বেতন-ভাতা কার্যকর হলে এ খাতে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা আমরা বৈঠকে তুলে ধরেছি। এ সিদ্ধান্ত কার্যকরে বাড়তি সময় চেয়েছি।’

এবিবির ভাইস চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘উপযুক্ত কারণ ও নথিপত্র থাকলে কোনো ব্যাংকারকে শাস্তি দিতে কোনো সমস্যা নেই। এটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিশ্চিত করেছে। শুধু আমানত সংগ্রহে ব্যর্থতার জন্য কারও চাকরি চলে যাওয়া ঠিক নয়, আমরাও এটা মনে করি।’