বিজ্ঞাপন

কী করে বুঝবেন আপনার সঞ্চয় নিরাপদ থাকবে কি না? এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হলো প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট রেটিং। ডাবল বি, ট্রিপল বি, ডাবল এ, ট্রিপল এ—এগুলো হচ্ছে বিভিন্ন ক্রেডিট রেটিং। বাংলাদেশের ৬০টি তফসিলি ব্যাংক ও ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হাতে গোনা কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের রয়েছে সর্বোচ্চ ক্রেডিট রেটিং ‘ট্রিপল এ’ বা ‘এএএ’। ডিপোজিটের জন্য এই প্রতিষ্ঠানগুলোই সবচেয়ে নিরাপদ। ‘ট্রিপল এ’ রেটিং নির্দেশ করে প্রতিষ্ঠানটি দায় পরিশোধে সর্বোচ্চ পরিমাণে সক্ষম। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে আসল ফেরত না পাওয়ার বা সুদের অর্থ না পাওয়ার মতো ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে না বললেই চলে।

default-image

নিরাপত্তা যাচাইয়ের আরেকটি পরিমাপক হচ্ছে একটি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ কতগুলো সেক্টরে রয়েছে, অর্থাৎ কত ধরনে খাতে ঋণ প্রদান করেছে, তা জেনে নেওয়া। আমরা যে প্রতিষ্ঠানগুলোয় টাকা রাখি, তারা বিভিন্ন সেক্টরে অর্থ বিনিয়োগ করে থাকে। তারা যে অর্থ বিনিয়োগ করে, তা কিন্তু গ্রাহকদের অর্থ। বিনিয়োগ যদি দু–একটি সেক্টরের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে কোনো কারণে ওই সেক্টরে ধস নামলে বিনিয়োগকারী ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানেরও ভরাডুবি হতে পারে। সঙ্গে ঝুঁকির মুখে পড়ে গ্রাহকের কষ্টার্জিত অর্থও। যে প্রতিষ্ঠানে টাকা রাখছেন, সেটির বিনিয়োগ–বৈচিত্র্য যত বেশি হয়, ওই প্রতিষ্ঠানে আপনার বিনিয়োগ বা সঞ্চয়ও হয় ততটা কম ঝুঁকিপূর্ণ।

সঞ্চয়ে নিরাপত্তার আরেকটি নির্ধারক খেলাপি ঋণের হার। বাংলাদেশের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে গড় খেলাপি ঋণের হার ২ থেকে ১০ শতাংশ। যেসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার ৫ শতাংশের ঊর্ধ্বে নয়, সেগুলো ডিপোজিটের জন্য ভালো।

পাশাপাশি একটি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগসমূহ দীর্ঘমেয়াদি না স্বল্পমেয়াদি, দেখে নিতে হবে সেটিও। স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগের প্রবণতা যদি অনেক বেশি হয়, তাহলে বুঝে নিতে হবে প্রতিষ্ঠানটির দায় পরিশোধ নিয়ে চিন্তা ও পরিকল্পনা নির্ভরযোগ্য নয়। অন্যদিকে, একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিমাণ বেশি থাকার অর্থ দীর্ঘ মেয়াদে সেটির আয়ের উৎস নিশ্চিত থাকা। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য টেকসই প্রবৃদ্ধি সহজ করে। দায় পরিশোধে এ রকম প্রতিষ্ঠানকে বেগ পেতে হয় না।

সঞ্চয়ের নিরাপত্তা অনেকাংশে নির্ভরশীল ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দৃঢ়তা ও সুনামের ওপর। আর্থিক খাতের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, যেসব প্রতিষ্ঠানে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাদি ঘটেছে, সেগুলোর শেয়ারহোল্ডার বা মালিকানা নির্ভরযোগ্য ছিল না। তাই ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে সর্বজনস্বীকৃত ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিরা বা প্রতিষ্ঠান রয়েছে কি না, তা দেখতে হবে। যে প্রতিষ্ঠানে ডিপোজিট রাখব, তা দেশ ও দেশের বাইরে ভালো প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত কি না, এর ভালো কিছু স্বীকৃতি রয়েছে কি না, সেটি দেখে রাখা উচিত। সাধারণত ভালো প্ল্যাটফর্ম থেকে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো নীতিগত অবস্থানের ক্ষেত্রে পথভ্রষ্ট হয় না এবং একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখে। এ রকম প্রতিষ্ঠানে সঞ্চয় থাকে সুরক্ষিত।

default-image

নিরাপত্তা যাচাইয়ের পরে দ্বিতীয় যে বিষয় বিবেচনা করতে হবে, তা হলো রেট অব রিটার্ন। রেট অব রিটার্ন মানে কি শুধুই সুদের হার? একেবারেই না। একজন চৌকস বিনিয়োগকারী বা সঞ্চয়কারী জানেন যে একটি অনির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানও ডিপোজিট পেতে মরিয়া হয়ে অনেক বেশি সুদের হার প্রদান করতে পারে। কিন্তু সেখানে সঞ্চয় নিরাপদ থাকবে তো? তাই সঠিক পদ্ধতিটি হলো সেরা ক্রেডিট রেটিংপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সুদের হার তুলনা করে দেখা। অর্থাৎ তুলনা হবে সব ‘ট্রিপল এ’ রেটিংপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের প্রদত্ত সুদের হারের মধ্যে। সুদের হারের সঙ্গে আর্থিক নিরাপত্তাও বিবেচনা করলে রেট অব রিটার্নকে সঠিকভাবে মাপা যায়। এতে সঞ্চয়ের নিরাপত্তা আর লাভজনকতা—দুইই নিশ্চিত করা হয়।

তৃতীয় ও সর্বশেষ বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে গ্রাহকসেবার মান। যে প্রতিষ্ঠানে অর্থ রাখছেন, তা আপনাকে সেরা সেবাটি দিতে কতটা তৎপর, তার ওপর নির্ভর করবে সঞ্চয় থেকে আপনার মানসিক তুষ্টি। কোম্পানিটিতে আপনি কতটা সহজে তথ্য সংগ্রহ বা লেনদেন করতে পারছেন, সঞ্চয় করতে গিয়ে প্রতিটি পদক্ষেপে কতটা সহজে কার্য সম্পাদন করা যাচ্ছে, কতটা দ্রুত তারা আপনার প্রয়োজনে সাড়া দিচ্ছে, আর্থিক বিবরণী বা এ ধরনের ডকুমেন্টের জন্য আবেদন করলে তা পাওয়া সহজ হচ্ছে কি না, প্রতিষ্ঠানের পুরো সিস্টেম গ্রাহকদের জন্য সহজ ও বন্ধুসুলভ কি না, পরিবর্তনশীল গ্রাহক চাহিদা মেটাতে প্রতিষ্ঠানটি যথেষ্ট আধুনিক কি না, ডিজিটাল সেবা রয়েছে কি না ইত্যাদি আপনার অভিজ্ঞতাকে ইতিবাচক বা নেতিবাচক করবে।

আর অবশ্যই জরুরি প্রয়োজনে তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ উত্তোলনের প্রয়োজন দেখা দিলে প্রতিষ্ঠানটি তা আপনাকে দিতে পারে কি না কিংবা সঞ্চয়ের বিপরীতে দ্রুততার সঙ্গে ঋণ প্রদান করতে পারে কি না, তা জানা খুবই জরুরি। কারণ, বিপদ কখনো অনুমান করা যায় না। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই যদি আপনাকে সঞ্চয় তুলে নিতে হয়, সে ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির নীতি গ্রাহকের জন্য কতটা অনুকূল, তা জানা দরকার। একইভাবে যেকোনো কারণে আপনার বড় কোনো খরচের কারণ তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে আপনার সঞ্চয়ের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি আপনাকে স্বল্প সময়েই ঋণ প্রদান করবে কি না, সেটিও তাদের গ্রাহকসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ডিপোজিট বা সঞ্চয়ের মেয়াদ বিভিন্ন রকম হতে পারে। আপনি আপনার অর্থ জমা রাখবেন আপনার সুবিধামতো মেয়াদ অনুযায়ী। সেটি তিন মাস থেকে শুরু করে অনেক বছর পর্যন্ত হতে পারে। যেখানে টাকা জমা রাখবেন, তারা গ্রাহকের চাহিদানুযায়ী মেয়াদ নির্ধারণে কতটা নমনীয়, তা বুঝে দেখুন। নিজের সুবিধামতো মেয়াদে অর্থ জমা রাখার সুযোগ আপনাকে নির্ভার রাখবে। এভাবে গ্রাহকসেবার মান যাচাই করে সঞ্চয়ের জন্য প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা আবশ্যক।

সাধারণত তিনটি বিষয় বিবেচনা করে ডিপোজিট করলে লাভজনকতার পাশাপাশি নিজের অর্থের সুরক্ষা বজায় রাখা সম্ভব হয়। সঠিক ডিপোজিট অনিশ্চিত সময়ের প্রস্তুতিতে রাখতে পারে অনেক এগিয়ে। অর্থনীতিবিদ ফারুক আহমেদ জানান, সঞ্চয়ের জন্য প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের আগে নিজে কিছু বিষয় যাচাই-বাছাই করেন। এর মধ্যে তিনি সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেন এনপিএল বা খেলাপি ঋণের হারকে। তিনি বলেন, ‘আমি যখনই ডিপোজিট করার সিদ্ধান্ত নিই, আগেই ভাবি না যে এর আগে যেখানে টাকা রেখেছিলাম, সেখানেই রাখব। প্রথমেই খোঁজ নিই যে কোথায় এনপিএল হার কত। যেমন মাস দুয়েক আগে ডিপোজিট করার আগে জানলাম আইপিডিসি ফাইন্যান্সের এনপিএল হার খুবই স্বস্তিদায়ক। সবকিছু মিলিয়ে ভালো মনে হওয়ায় আইপিডিসিতে ডিপোজিট রেখেছি।’

সম্প্রতি মো. নুরুল আবসারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত মাসে তিনি আইপিডিসি ফাইন্যান্সে একটি ফিক্সড ডিপোজিট অ্যাকাউন্ট খোলেন। কী চিন্তা করে অ্যাকাউন্টটি আইপিডিসিতে খুললেন—এর উত্তরে তিনি বলেন, ‘যখন দেখলাম আইপিডিসি রেটটা ভালো দিচ্ছে, শুধু তা–ই না, প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে আছে স্বয়ং বাংলাদেশ সরকার, ব্র্যাকের মতো নামকরা প্রতিষ্ঠানও আছে, তখন একটা আস্থা পেলাম যে এখানেই ডিপোজিটটা করে ফেলি।’

করপোরেট সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন