জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০১৮, এ চার বছরে প্রতিবছর দেড় থেকে দুই লাখ নতুন তরুণ করদাতা করজালে যুক্ত হয়েছিলেন। ধীরে ধীরে এ আগ্রহ বেড়েছে। তাই গত চার বছরের মধ্যে গড়ে আট লাখ তরুণ করদাতারা যুক্ত হচ্ছেন করজালে। তাঁরাই এখন কর আহরণের ক্ষেত্রে আশা জাগাচ্ছেন। কর দেওয়ার আগ্রহ বাড়ছে তরুণদের মধ্যে।

এনবিআরের আয়কর বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, প্রতিবছর যত লোক কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) নেন, তাঁদের মধ্যে ৮০ শতাংশই তরুণ। তাঁরা কর দিতে ইচ্ছুক কিংবা তাঁদের করযোগ্য আয় আছে। এনবিআরের হিসাবে, তরুণ করদাতা চিহ্নিত করার মানদণ্ড ভিন্ন। যাঁদের বয়স ৪০ বছরের কম, তাঁদেরই তরুণ করদাতা মনে করেন এনবিআর কর্মকর্তারা। প্রতিবছর অন্যান্য শ্রেণির পাশাপাশি তরুণ করদাতা শ্রেণিতে সেরা পাঁচজন করদাতাকে সম্মাননা দেওয়া হয়।

এনবিআরের সর্বশেষ হিসাবে কর শনাক্তকরণ নম্বরধারীর (টিআইএনধারী) সংখ্যা এখন ৭৯ লাখ ৮৮ হাজার ৮২৫। ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে টিআইএনধারী ছিলেন প্রায় ৩৯ লাখ। চার বছরের ব্যবধানে টিআইএনধারীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। নতুন টিআইএন নিয়েছেন প্রায় ৪১ লাখ। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩৩ লাখ টিআইএনধারীর বয়স ৪০ বছরের কম।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে এযাবৎকালের সর্বোচ্চ ১৩ লাখ করদাতা টিআইএন নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১০ লাখের বেশি টিআইএনধারীর বয়স ৪০ বছরের কম। এ ছাড়া ২০২০-২১ অর্থবছরে ৯ লাখ, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৯ লাখ এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১০ লাখ নতুন করদাতা টিআইএন নিয়েছেন।

এনবিআরের আয়কর বিভাগের সাবেক সদস্য সৈয়দ আমিনুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ৩৮ ধরনের সেবার বিপরীতে রিটার্নের প্রাপ্তিস্বীকারপত্র লাগবে। তাই এবার রিটার্ন জমা ২০ থেকে ২৫ লাখ বাড়বে। তাঁদের বেশির ভাগই হবেন তরুণ করদাতা। এটি আশার খবর। অন্যদিকে তরুণ করদাতাদের উৎসাহিত করার জন্য বাজেটে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেই। এর ফলে তরুণেরা কর দিতে উৎসাহ বোধ করেন না বলে তিনি মনে করেন।

প্রতিবছর রিটার্ন জমার মৌসুমে কর মেলা আয়োজন করে এনবিআর। এসব মেলায় অল্প বয়সী করদাতাদের ব্যাপক ভিড় দেখা যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তাঁরা কর বিবরণী জমা দেন। এতে কর নিয়ে তরুণদের আগ্রহ প্রকাশ পায়।

রাজধানীর উষা ট্রেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুলতান মাহমুদ ২০১৪ সালে আমদানি-রপ্তানির ব্যবসা শুরু করেন। ২০১৬ সালে এনবিআর প্রথমবারের মতো নতুন করদাতাদের সম্মাননা দেওয়া শুরু করে। সে সময়ই সুলতান মাহমুদ এই সম্মাননা পান। এর পর থেকে প্রতিবারই তিনি কর দিয়ে আসছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কোভিডের সময় আয় অনেক কমে গিয়েছিল। তারপরও কর দিয়েছি। তরুণদের উৎসাহিত করলে তাঁরা নিয়মিত কর দেন।’

দেশের শ্রমবাজারে তরুণেরাই নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দেশে যত কর্মক্ষম মানুষ আছেন, তাঁদের অর্ধেকের বেশির বয়স ৪০ বছরের কম। তাঁদের মধ্যে যাঁদের করযোগ্য আয়, তাঁরাই কর দেবেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে কাজ করতে সক্ষম মানুষের সংখ্যা ৬ কোটি ৩৪ লাখ। তাঁদের মধ্যে ৩ কোটি ৫১ লাখ তরুণ কর্মজীবী। যাঁদের বয়স ৪০ বছর পার হয়নি।

বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ করের ভিত্তি বেশ কম। এখনো বিশ্বের সবচেয়ে কম কর-জিডিপি অনুপাতের দেশগুলোর মধ্যে একটি বাংলাদেশ। প্রায় ৮০ লাখ টিআইএনধারী থাকলেও এক-তৃতীয়াংশ বছর শেষে আয়-ব্যয়ের খবর জানিয়ে রিটার্ন দেন। গতবার মাত্র ২৫ লাখ টিআইএনধারী রিটার্ন দিয়েছিলেন। মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র দেড় শতাংশ মানুষ সরাসরি কর দেন। অথচ টিআইএনধারী সবার রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক। যাঁরা রিটার্ন দেন না, তাঁদের বেশির ভাগই তরুণ। রিটার্ন দেওয়া নিয়ে ভয়ভীতিও মূল কারণ বলে জানা গেছে। আবার তরুণদের রিটার্ন দেওয়ায় উৎসাহিত করার কোনো ব্যবস্থাও নেই। তরুণদের জীবনধারায় অনলাইন এখন জীবনের অনুষঙ্গ হয়ে গেছে। তরুণদের নিরুৎসাহিত হওয়ার একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। দুই বছর আগে অনলাইনে রিটার্ন দিলে বিশেষ কর রেয়াত দেওয়ার সুবিধা চালু থাকলেও কেউ অনলাইনে রিটার্ন দিতে পারেননি। ফলে তরুণেরা নিরুৎসাহিত হয়েছেন।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, আয়কর বিভাগ প্রতিবছর যত টাকা আয়কর পান, তার ১৫–২০ শতাংশ আয়কর রিটার্ন জমা খাত থেকে আসে।