বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

১৯৩৫ সালে বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মুনসেফ হিসেবে যোগ দেন এ কে খান। ১৯৪৪ সালে তিনি পদত্যাগ করে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। ব্যবসায় তিনি সফল হন। এরপর রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য হয়েছিলেন। ভারত ভাগ হলে তিনি পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য হন। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত শিল্প, পূর্ত, সেচ, বিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পর রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে তিনি পুরোপুরি ব্যবসায় মনোযোগ দেন।

এখানে ১৯৫১-৫২ সালের বাজেট বিলের ওপর ১৯৫১ সালের ২৪ মার্চ দেওয়া এ কে খানের একটি বক্তব্যের কথা উল্লেখ করা যায়। তিনি বলেছিলেন, ‘বর্তমান যুগটি বিকেন্দ্রীকরণ ও আঞ্চলিক স্বয়ংসম্পূর্ণতার যুগ। আমরা দেখতে পাচ্ছি, ছয়-শালা পরিকল্পনায় পূর্ব বাংলায় যেখানে মোট জনগোষ্ঠীর ৫৬ শতাংশ লোক বাস করে, সেখানে বরাদ্দের পরিমাণ রাখা হয়েছে শতকরা ২৩ ভাগের কম। কৃষি খাতে ৮২ কোটি টাকা বরাদ্দ ধরা হয়েছে এবং পূর্ব বাংলার জন্য পরিকল্পিত প্রকল্পগুলোর জন্য সাকল্য বরাদ্দ দেখানো হয়েছে ৫.৬ কোটি টাকা। পানি-বিদ্যুৎ শক্তি উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৪৫ কোটি টাকা এবং সেখানে পূর্ব বাংলার অংশ মাত্র ৫ কোটি টাকা। শিল্প খাতে বস্ত্রশিল্পে (পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য) বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩০ কোটি টাকা এবং পাটশিল্পে (পূর্ব বাংলার জন্য) ধরা হয়েছে মাত্র ১১ কোটি টাকা। এ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে শুধু অতীতে নয়, বর্তমানে নয়, ভবিষ্যতেও দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় পূর্ব বাংলা তার ন্যায্য অংশীদারত্ব পাবে না। কেন্দ্রীয় সচিবালয়ে পূর্ব বাংলার কদাচিৎ প্রতিনিধিত্ব এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ে কোনো প্রতিনিধিত্ব না থাকার মতো দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতিই কি এ জন্য দায়ী? গত চার বছরে আপনার বৈদেশিক মুদ্রার শতকরা ৮০ ভাগ অর্জন করেছে পূর্ব বাংলা। আমরা আমাদের প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয় করছি, অথচ এ খাতে পূর্ব বাংলার জন্য ব্যয় করা হচ্ছে দুই কোটি টাকার সামান্য বেশি।...পাকিস্তানকে নিশ্চিত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে দেশের প্রতিটি অংশের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিয়ে গড়ে তুলতে হবে সে ভিত্তি। বাঙালিই হোক, বালুচই হোক, সিন্ধি বা পাঞ্জাবি; যা-ই হোক, দেশের প্রতিটি লোকের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা থাকতে হবে।’

এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানির প্রতিষ্ঠা ১৯৪৫ সালে, চট্টগ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় গবেষণা সংস্থা ১৯৮৪ সালে ‘বাংলাদেশের কয়েকজন শিল্পোদ্যোগীর জীবনকাহিনী’ শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ ফারুক ও রেজাউল করিম সম্পাদিত বইটিতে এ কে খান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ১৯৩৩ সালে আবুল কাসেম খান বিয়ে করেছিলেন বার্মায় ব্যবসারত চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবদুল বারী চৌধুরীর কন্যাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আবদুল বারী চৌধুরী রেঙ্গুনের ব্যবসা ছেড়ে চট্টগ্রামে চলে আসেন। রেঙ্গুনে সম্পত্তির সিংহভাগই তিনি ফেলে এসেছিলেন। সঙ্গে এনেছিলেন মাত্র কয়েক লাখ টাকা। এই মূলধন নিয়েই ব্যবসা শুরু করেছিলেন এ কে খান।

default-image

শুরুতে নির্মাণ ঠিকাদারির ব্যবসা করতেন। দেশ ভাগের পরে চট্টগ্রামে স্থায়ী হয়ে আবুল কাশেম খান ১৯৫২ সালে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকায় চট্টগ্রামের কালুরঘাট অঞ্চলে একটি দেশলাই কারখানা এবং আড়াই লাখ টাকায় একটি প্লাইউডের কারখানা নির্মাণ করেন। তবে তাঁর তৈরি সবচেয়ে বড় কারখানা ছিল পাঁচ কোটি টাকা মূলধনের চিটাগাং টেক্সটাইল মিলস।

পরবর্তী সময়ে ১৯৫৮-১৯৬২ সাল পর্যন্ত সময়ে পাকিস্তানের শিল্পমন্ত্রী থাকার সময়ে বাঙালি উদ্যোক্তাদের জন্য পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন করপোরেশনকে ভাগ করে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আলাদা একটি সংস্থা পূর্ব পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন করপোরেশন (ইপিআইডিসি) গঠন করেন। তিনি যখন মন্ত্রিত্ব শুরু করেছিলেন, তখন এ অঞ্চলে বাঙালি মালিকানাধীন জুট মিল ছিল একটি। তাঁর চেষ্টায় এই তিরিশে দাঁড়ায়। তখন এ অঞ্চলে বাঙালি মালিকানাধীন কোনো ব্যাংক ছিল না। তিনি মন্ত্রী থাকাকালে বাঙালি মালিকানায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমতি নিয়ে আসেন। ফলে বাঙালি মালিকানায় প্রথম ব্যাংক ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক (বর্তমানে পূবালী ব্যাংক) প্রতিষ্ঠিত হয়।

default-image

১৯৯১ সালে আবুল কাশেম খানের মৃত্যু হয়। এ কে খানের বড় ছেলে প্রয়াত এ এম জহিরুদ্দিন খান ১৯৫৮ সালে এ কে খান গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৯১ সালে বাবার মৃত্যুর পরে তিনি গ্রুপের চেয়ারম্যান হন। পরবর্তী সময়ে এ কে খানের দ্বিতীয় ছেলে এ কে শামসুদ্দিন খান এই শিল্পগোষ্ঠীর নেতৃত্ব দেন। তখন এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানির দায়িত্ব নেন তাঁর ছেলে এ এম জহিরুদ্দিন খান। মুক্তিযোদ্ধা এ এম জহিরুদ্দিন খান ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত পরিকল্পনা ও শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০০৫ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। এর পরে গ্রুপের দায়িত্ব নেন এ কে খানের আরেক সন্তান এ কে শামসুদ্দিন খান।

আর বর্তমান চেয়ারম্যান এ কে খানের কন্যা জেবুন নাহার ইসলাম। এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানির কৃষি, বস্ত্র, টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, বন্দর সেবা, মাছ ধরা, পুঁজিবাজার, পর্যটন, আবাসনসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা রয়েছে। আবুল কাসেম খান ছিলেন দেশের শিল্পায়নের অন্যতম পথপ্রদর্শক। তাঁর দেখানো পথ ধরেই উদ্ভব ঘটেছে আরও অনেক উদ্যোক্তা শ্রেণির।

এ কে খান গ্রুপের পরিচালক আবুল কাসেম খান প্রথম আলোকে বলেন, দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে অবদান রাখা নায়কদের মধ্যে আমার দাদা আবুল কাসেম খানের (এ কে খান) নাম উচ্চারিত হয় বলে আমরা গর্ববোধ করি। এ কে খানের ছিল মূলত কর্মসংস্থান সৃষ্টির নেশা। একের পর এক পাট, বস্ত্র ইত্যাদি কারখানা তৈরি করে গেছেন তিনি। তাঁর কাছ থেকে মন্ত্রের মতো কয়েকটা জিনিস শিখেছি। ছোট-বড় সবাইকে শ্রদ্ধা করতে হবে, মনোযোগ দিয়ে মানুষের কথা শুনতে হবে, অপ্রয়োজনীয় খরচ করা যাবে না এবং কোনোভাবেই অর্থের অহংকার করা যাবে না।

আবুল কাসেম খান বলেন, আমার ২১ বছর বয়সে দাদা মারা যান। তাঁর সঙ্গে অনেক গল্প হয়েছে আমার। বাবার কাছ থেকেও অনেক শুনেছি। একদিন বাবা হাতঘড়ি প্রসঙ্গে দাদাকে বললেন, ‘আপনি এখনো সিকো পরেন?’ দাদা বললেন, ‘টাইম তো দিচ্ছে।’ আমাদের গ্রুপে এখন চতুর্থ প্রজন্ম চলছে। দাদার দর্শন যত দূর সম্ভব সবাই অনুসরণ করি।

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন