বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সার্বিকভাবে বলা চলে, এত দিন বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণপ্রক্রিয়া, সব সূচকে মান অর্জন, সুপারিশ—এসবই ছিল জাতিসংঘের কারিগরি কমিটির কার্যক্রম। এখন বাংলাদেশের উত্তরণের বিষয়টি রাজনৈতিক অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হলো। কারণ, সাধারণ পরিষদে সব দেশের প্রতিনিধি থাকেন। কারিগরি কমিটিগুলোতে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা থাকেন। যেমন সিডিপির একজন সদস্য হলেন বাংলাদেশের সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

সবকিছু ঠিক থাকলে সাধারণত ইকোসকের কমিটির ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) সুপারিশের তিন বছরের মাথায় একটি দেশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের স্বীকৃতি লাভ করে। কিন্তু এবার করোনা পরিস্থিতির কারণে সুপারিশ পাওয়া দেশগুলোকে আরও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রস্তুতির সময় দেওয়া হয়েছে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সুপারিশটি গৃহীত হলেই কি বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হয়ে গেল কিংবা বের হবে বলে নিশ্চিত করা যায়? আসলে তা নয়। ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। বড় কোনো বিপর্যয়ে পড়া যাবে না। বিশেষ করে তিন বছর পরপর সিডিপি যে মূল্যায়ন করে তাতে ভালো করতে হবে। ২০২৪ সালে সিডিপি আবার মূল্যায়ন করবে। তখনো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে। তা না হলে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ চাইলে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হওয়ার অনুমোদনের বিষয়টি আরও পিছিয়ে দিতে পারে। একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে— ২০০৩ সালে মালদ্বীপকে এলডিসি থেকে উত্তরণের সুপারিশ করে সিডিপি।

২০০৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে স্বীকৃতি পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০০৪ সালের সুনামির কারণে মালদ্বীপের অর্থনীতি ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়ে। ফলে এলডিসি থেকে উত্তরণের স্বীকৃতি পেতে মালদ্বীপকে ২০১১ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
আবার সিডিপির ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে একটি দেশ পাস করার সঙ্গে সঙ্গে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ তা গ্রহণ না–ও করতে পারে। যেমন ২০১৮ সালে সিডিপির ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে নেপাল এলডিসি থেকে বের হওয়ার সুপারিশ অর্জন করেছিল। কিন্তু নেপালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের কারণে সেবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ তা গ্রহণ করেনি। এবার বাংলাদেশের সঙ্গে নেপাল ও লাওসের সুপারিশ গ্রহণ করা হয়েছে।

রপ্তানি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে

এলডিসি থেকে বের হলে বাংলাদেশের বেশ কিছু বাণিজ্যসুবিধা হারাবে। বাংলাদেশের রপ্তানি খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি আছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে বাংলাদেশের রপ্তানি ৮ থেকে ১০ শতাংশ কমতে পারে। এতে বছরে প্রায় ২৫০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ রপ্তানি আয় কমবে। বর্তমান বাজার দরে টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ২১ হাজার কোটি টাকার বেশি। অবশ্য ২০২৬ সালের পর আরও তিন বছর ইউরোপীয় ইউনিয়নে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যসুবিধা থাকবে।

উন্নয়ন সংস্থাগুলো ও দেশগুলোর কাছ থেকে ঢালাও সহজ শর্তে ঋণ মিলবে না। বাংলাদেশকে নানা ধরনের শর্ত পূরণ করতে হবে। সুদের হার বাড়তে পারে। বাংলাদেশকে সহজ ও কঠিন—উভয় শর্তের ঋণ নিতে হবে। এ ছাড়া মেধাস্বত্ব আইনের কঠোর প্রয়োগ হতে পারে।

দেশের অভ্যন্তরে সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগী হতে হবে। এগুলো হলো ব্যক্তি বিনিয়োগ বাড়াতে পরিবেশ সৃষ্টি করা; কর আহরণ বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি।

এলডিসিই উন্নয়নশীল দেশ

অনেকে বলে থাকেন, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বের হয়ে আমরা উন্নয়নশীল দেশ হতে যাচ্ছি। এটি ভুল। সব এলডিসিই উন্নয়নশীল দেশ। জাতিসংঘ তার সদস্যদেশগুলোকে দুই শ্রেণিতে বিভক্ত করে। একটি উন্নত দেশ এবং অপরটি উন্নয়নশীল দেশ। ১৯৭১ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে যেসব দেশ পিছিয়ে আছে, তাদের অগ্রগতির জন্য কিছু বাড়তি সুবিধা দিতে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা করা হয়। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক নুরুল ইসলামের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে ওই তালিকাভুক্ত হয়। বর্তমানে ৪৬টি দেশ এ তালিকায় আছে।

সিডিপি প্রতি তিন বছর পরপর তিনটি সূচকে ওই দেশের মূল্যায়ন করে থাকে। সূচকগুলো হলো মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতার মান। কোনো দেশ এই তিনটির মধ্যে দুটির মান বা মাথাপিছু আয়ের নির্দিষ্ট মানের দ্বিগুণ অর্জন করলে প্রাথমিকভাবে মনোনীত করা হয়। তিন বছর পরপরের মূল্যায়নেও একইভাবে মান অর্জন করতে হয়। এরপর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের পাঠানোর পর সবকিছু ঠিক থাকলে এলডিসি উত্তরণের স্বীকৃতি মেলে।

উন্নয়নশীল বনাম মধ্যম আয়ের দেশ

উন্নয়নশীল ও মধ্যম আয়ের দেশ নিয়ে অনেকে দ্বন্দ্বে পড়ে যান। জাতিসংঘ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ—এই দুই শ্রেণিতে সদস্যদেশকে বিভক্ত করে। অর্থনীতি, আর্থসামাজিক অবস্থা, টেকসই পরিস্থিতি—এসব দিয়ে জাতিসংঘ একটি দেশকে মূল্যায়ন করে। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশ। উন্নয়নশীল দেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে আছে।

অন্যদিকে মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে তার সদস্যদেশগুলোকে বিভক্ত করে বিশ্বব্যাংক। এই সংস্থা নিম্ন, মধ্যম ও উন্নত আয়ের দেশ—এই তিনটি শ্রেণিতে সদস্যদের মূল্যায়ন করে। মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মধ্যে আবার দুই ভাগ আছে। যেমন নিম্নমধ্যম আয় ও উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ। বাংলাদেশে ২০১৫ সালে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশ। ২০৩০ সালের মধ্যে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্য আছে।

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন