তালা–চাবিওয়ালার ঘরের চাবি ঘোরাবে কে

আলমগীর হোসেন

আলমগীর হোসেন পেশায় তালা-চাবিওয়ালা। বিকল্প চাবি বানানোই তাঁর পেশা। বসেন রাজধানীর উত্তরার আজমপুরের রবীন্দ্রসরণিতে। সাধারণত কেউ তালা-চাবিওয়ালাদের খোঁজখবর তেমন একটা রাখেন না। যখন বিকল্প চাবির প্রয়োজন হয়, তখনই খোঁজ পড়ে তালা-চাবিওয়ালাদের।

এখন সবাই ঘরে, বিকল্প তালা-চাবির প্রয়োজনও কম। তাই করোনায় তালা-চাবিওয়ালা আলমগীর হোসেনের কাছে তেমন কেউ আসেন না। এতেই বিপদে পড়েছেন তিনি। এখন বলতে গেলে সংসারের উনুন জ্বালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।

গত মঙ্গলবার দুপুরে রবীন্দ্রসরণিতে বসেই কথা হলো আলমগীর হোসেনের সঙ্গে। করোনায় নিজের আয়–রোজগার কমল কি না, জিজ্ঞেস করতেই যেন কিছুটা আড়ষ্ট হয়ে যান তিনি। এরপর সরকারি সহায়তা পেয়েছেন কি না, এমন প্রশ্ন করার সঙ্গে সঙ্গেই কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গে বলে ওঠেন, ‘সরকার কি আমাগো কথা ভাবে? ভোট আসলে নেতারা পাঞ্জাবি পরে এই রাস্তা দিয়ে যান, আর আমাগো লগে হ্যান্ডশেক করেন। রিলিফের কার্ড আনতে গেলে বলেন, “পরে আইসো।”’

করোনা অতিমারি আলমগীর হোসেনের জীবিকায় লাথি মেরেছে। তালা-চাবির ব্যবসা নেই বললেই চলে। আলমগীর হোসেন জানান, আগে প্রতিদিন ৬০০-৭০০ টাকা রোজগার হতো। এখন সারা দিন বসে থাকলেও দুই-তিনজন গ্রাহক মেলে না। রোজগার বড়জোর ২০০-২৫০ টাকা।

আলমগীর হোসেন মন খারাপ করে বলেন, ‘এই টেহা দিয়ে কি সংসার চলে? বউ, দুই মেয়েসহ চারজনের সংসারে দিনে চাল লাগে দুই থেকে আড়াই কেজি। মাছ-মাংসের কথা চিন্তাও করতে পারি না। ডাল-সবজি দিয়ে ভাত খাই। দিন শেষে যা রোজগার হয়, তা দিয়ে বাজার করে ঘরে যাই। আগামী মাসে ঘরভাড়া দিমু কেমনে জানি না।’ তিনি পরিবার নিয়ে উত্তরার কামারপাড়া এলাকায় একটি ঘর ভাড়া নিয়ে থাকেন। মাসে ভাড়া ৩ হাজার টাকা।

আলমগীরের বড় মেয়ে ক্লাস এইটে পড়ে। ছোট মেয়ে আয়াতের বয়স আড়াই বছর। আর স্ত্রী করোনা শুরু হওয়ার আগে টঙ্গীর একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। করোনার কারণে গত বছরের জুলাই মাসে ছাঁটাই হন। সেদিনই আসলে তাঁদের পরিবারের স্বাচ্ছন্দ্য শেষ হয়ে যায়। এক বছর ধরে অনেকটা দিন আনি দিন খাই, এভাবেই চলছে তাঁদের সংসার।

উত্তরার পুরো রবীন্দ্রসরণিতে সারি সারি গাছের ছায়ায় ৩০-৩৫টি তালা-চাবির দোকান। আলমগীর হোসেনের মতো সবার একই অবস্থা। বিকল্প চাবি বানানো একটি কারিগরি কাজ। কেউ মেশিন ব্যবহার করেন আর কেউ হাতেই বানান। আলমগীর হোসেন জানান, ১৩ বছর ধরে তিনি রবীন্দ্রসরণিতে এই ব্যবসা করেন। এই কাজ ছাড়া আর কোনো কাজ শেখেননি। বিধিনিষেধের কারণে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত পুলিশ বসতে দেয়। এরপর উঠিয়ে দেয়। আলমগীর হোসেন রোজগার বাড়ানোর জন্য সন্ধ্যায় কাজ খুঁজে বেড়ান।